উপমহাদেশের সমকালীন গুরুত্বপূর্ণ নারী চলচ্চিত্র নির্মাতা রুবাইয়াত হোসেন

জাজাফী

সৈয়দা রুবাইয়াত হোসেন আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত ও প্রতিষ্ঠিত বর্তমান সময়ের একজন মেধাবী বাংলাদেশি নারী চলচ্চিত্র নির্মাতা, লেখক, প্রযোজক এবং গবেষক।১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে নারীবাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে নির্মিত “মেহেরজান” চলচ্চিত্র পরিচালনার মাধ্যমে ২০১১ সালে চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসাবে তিনি আত্মপ্রকাশ করেন। এই চলচ্চিত্রটি বাংলাদেশে তুমুল বিতর্কের সৃষ্টি করে এবং মুক্তির মাত্র এক সপ্তাহ পরেই চাপের মুখে পরিবেশক সিনেমা হল থেকে নামিয়ে নেয়। তবে এটি আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত ও বিভিন্ন চলচ্চিত্র উৎসবে পুরস্কৃত হয়েছে।

তার দ্বিতীয় ছবি “আন্ডার কন্সট্রাকশন” সমকালীন ঢাকা শহরের প্রেক্ষাপটে মধ্যবিত্ত এক নারীর আত্ম-অনুসন্ধানের চিত্র। ২০১৫ সালে সিয়াটল চলচ্চিত্র উৎসবে প্রিমিয়ারের পর জানুয়ারি ২১, ২০১৬ বাংলাদেশে ছবিটি মুক্তি পায়।

তার নির্মিত “মেড ইন বাংলাদেশ” টরন্টো চলচ্চিত্র উৎসব ২০১৯ এ প্রিমিয়ারের পর একই বছরের ডিসেম্বরে ফ্রান্স, পর্তুগাল ও ডেনমার্কে ৭০টির অধিক সিনেমা হলে মুক্তি পায়। ২০২০ সালের শুরুতে কানাডা, আমেরিকা ও বিশ্বের অন্যান্য দেশেও ছবিটি মুক্তি পায়।

রুবাইয়াত হোসেন বাংলাদেশের বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ সৈয়দ আবুল হোসেন ও খাজা নার্গিস হোসেনের মেয়ে। সম্প্রতি তিনি উপমহাদেশের সমকালীন গুরুত্বপূর্ণ ১০ নারী নির্মাতার তালিকায় প্রথম স্থানে আছেন । এ তালিকায় আরও রয়েছেন পাকিস্তানের মেহরীন জব্বার, ভারতীয় নির্মাতা সোনালি বোস, সুমন কিট্টুর, ওরভাজি ইরানি, মেঘনা গুলজার, মঞ্জু বোরাহ, শতরূপা সান্যাল, জয়া আখতার ও ববি শর্মা বড়ুয়া।

রুবাইয়াত হোসেন মূলত একজন গবেষক।সত্যজিৎ রায় এবং ঋত্বিক ঘটকের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে রুবাইয়াত হোসেন চলচ্চিত্রে আগ্রহী হন এবং ২০০২ সালে নিউইয়র্ক ফিল্ম একাডেমিতে চলচ্চিত্র পরিচালনায় ডিপ্লোমা সম্পন্ন করেন। তিনি প্রখ্যাত স্মিথ কলেজ থেকে উইমেন স্ট্যাডিজে স্নাতক এবং পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দক্ষিণ এশীয় গবেষণা ও নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের টিশ স্কুল অফ আর্টস থেকে চলচ্চিত্র বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী লাভ করেন।
তার আগ্রহের বিষয়ের মধ্যে রয়েছে সুফিজম, বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদ, বাঙ্গালী মর্ডানিটি এবং ফিমেল সেক্সুয়ালিটি ইত্যাদি। তিনি আইন ও শালিস কেন্দ্র, নারীপক্ষ-তে নারী অধিকার নিয়ে কাজ করেছেন। এছাড়া তিনি ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির ইকনোমিক্স এবং সোশ্যাল সায়েন্স বিভাগে পার্টটাইম শিক্ষকতা করছেন। ব্যক্তিগত জীবনে রুবাইয়াত হোসেন বিবাহিত। জুন ২০০৮ সাল থেকে তিনি চলচ্চিত্র পরিচালক ও প্রযোজক আশিক মোস্তফার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ। ২০০২ সালে তিনি ফুলকুমার নামে একটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মান করেন। এরপর তিনি কিছু স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মান করে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেন। তার নির্মিত স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রগুলো হল – প্রিয় আমি (৮ মিনিট), বালিকার গোল্লাছুট (৫২ সেকেন্ড), সীমান্ত (১ মিনিট ১২ সেকেন্ড)। এ সকল ছবিই তিনি ২০০৫ সালে নির্মান করেন। মেহেরজান চলচ্চিত্র নির্মানের মাধ্যমে তিনি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মান শুরু করেন। এছাড়া তিনি সাহিত্যচর্চার সাথে যুক্ত আছেন। রুবাইয়াত হোসেন ব্যক্তি জীবনে একাধিক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন তার মধ্যে কয়েকটি
  • এমিলি গিমে পুরস্কার – প্যারিসের গিমে মিউজিয়াম কর্তৃক প্রদত্ত
  • জুরি এওয়ার্ড ও ক্রিটিক এওয়ার্ড, ভেসুল এশীয় চলচ্চিত্র উৎসব, ফ্রান্স
  • শ্রেষ্ঠ উদীয়মান পরিচালক পদক, নিউ ইয়র্ক এশিয়ান আমেরিকান আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব
  • অরসন ওয়েলস পদক, টিবুরন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র
  • সমালোচক পুরস্কার, জয়পুর আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব, ভারত
  • জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ২০১৬ – শ্রেষ্ঠ সংলাপ
  • জুরি পুরস্কার ও দর্শক পুরস্কার, এমিয়েন্স আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব, ফ্রান্স
  • প্রিমিও ইন্টারফেডি, তুরিন (টোরিনো) চলচ্চিত্র উৎসব
  • দর্শক পুরস্কার, আফ্রিকান ডায়াস্পোরা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব।

রুবাইয়াত হোসেন এবং তার জীবনসঙ্গী আশিক মোস্তফা ২০০৮ সালে বাংলাদেশ ভিত্তিক চলচ্চিত্র নির্মাণ সংস্থা খনা টকিজ (পূর্বে ইরা মোশন পিকচার্স নামে পরিচিত) প্রতিষ্ঠা করেন যা দেশে ও আন্তর্জাতিকভাবে সমাদৃত বেশ কিছু চলচ্চিত্র নির্মানের পাশাপাশি বাংলাদেশের তরুণ চলচ্চিত্র নির্মাতাদের আন্তর্জাতিক অঙনে তুলে ধরার পেছনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে।

10 জানুয়ারি 2021