বাংলা ভাষায় অনুবাদ সাহিত্যঃ মাসরুর আরেফিনের অবদান

– জাজাফী

এক ভাষার সাহিত্য অন্য ভাষার পাঠকদের সামনে তুলে ধরার প্রধানতম মাধ্যম হলো অনুবাদ। অনুবাদের মাধ্যমেই আমরা রুশ ভাষার সাহিত্যিকেরা কি লিখছেন বা জাপানী লেখকদের লেখার গুনমান কেমন তা বুঝতে পারছি।একজন পাঠকের পক্ষে ভিন্ন ভিন্ন ভাষার সাহিত্যের স্বাদ নেওয়ার জন্য অনেক ভাষা রপ্ত করা সম্ভব নয়।ফলে এই কঠিন কাজটি পাঠকদের জন্য আরও সহজ করে তোলে অনুবাদ সাহিত্য। আন্তর্জাতিক ভাষা হিসেবে ইংরেজী কম বেশি সবাই জানলেও যে কোন সাহিত্য যদি ইংরেজীতে অনুদিত হয় তার প্রকৃত স্বাদ পাওয়া সব সময় সবার পক্ষে সম্ভব নয়।মাতৃভাষার সাথে পৃথিবীর দ্বিতীয় কোন ভাষাকে তুলনা করা যায় না। একজন ভিন দেশী অন্য কোন দেশের ভাষা সম্পর্কে যতই পান্ডিত্য অর্জন করুন না কেন তিনি সেই ভাষায় কথা বলা একজনের সাথে পেরে উঠবেন না। সাহিত্যে অনেক সময় আঞ্চলিক শব্দ যেমন ব্যবহার করা হয় তেমনি অনেক প্রতিশব্দ এবং রুপক শব্দ ব্যবহার করা হয়ে থাকে যা ভিন্ন কোন ভাষায় কথা বলা পাঠকের কাছে সম্পুর্ন অপরিচিত হতেই পারে, যেহেতু তা ভিনদেশী অভিধানে যুক্ত নয়। আর এই সব দিকগুলো আরও সহজ হয়ে ওঠে অনুবাদকের কল্যাণে।

বাংলাদেশে যারা অনুবাদ সাহিত্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন তাদের মধ্যে সর্বাগ্রে যার নাম আসে তিনি হলেন অধ্যাপক কবীর চৌধুরী। তিনি তার দীর্ঘজীবনে অনেক নান্দনিক অনুবাদকর্ম আমাদের উপাহার দিয়ে আমাদের সমৃদ্ধ করেছেন। নোবেলজয়ী নাগিব মেহফুজ থেকে শুরু করে ব্রিটিশ ও আমেরিকান নামকরা সাহিত্যিকদের সাহিত্য কর্ম বাংলায় অনুবাদ করে আমাদের সাহিত্যচর্চার পথ উর্বর করে গেছেন তিনি। কবীর চৌধুরীর পর যারা বাংলাদেশের অনুবাদ সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কবি শামসুর রাহমান, জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, সৈয়দ শামসুল হক, হায়াৎ মামুদ, দ্বিজেন শর্মা, রকিব হাসান, খন্দকার আশরাফ হোসেন, সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, কায়সার হক, ফকরুল আলম, আনোয়ার হোসাইন মঞ্জু আবদুস সাত্তার, এ এ রেজাউল করিম, সাজ্জাদ শরীফ ও রফিকুম মুনীর চৌধুরী, রাজু আলাউদ্দিন,জুলফিকার নিউটন,মাসরুর আরেফিন এবং অনীশ দাস অপু প্রমুখ। যদিও জুলফিকার নিউটনের অনুবাদ নিয়ে অনেক জলঘোলা হয়েছে, কুম্ভীলকবৃত্তির প্রমান হাজির করেছে অসংখ্য পাঠক এবং লেখক সেসব কথা বাদ দিলাম। আজ সেই সব অনুবাদকদের মধ্য থেকে আমরা কথা বলবো এমন একজন সম্পর্কে যিনি একাধারে অনুবাদক,কথাসাহিত্যিক এবং কবি।একাধিক গুনের অধিকারী মানুষটির নাম মাসরুর আরেফিন।সাহিত্যের অন্যান্য শাখায় তাঁর সমান বিচরণ থাকলেও আমরা আজ শুধু তাঁর অনুবাদ কর্ম নিয়ে কথা বলবো। মাসরুর আরেফিনের অনুবাদ সাহিত্য নিয়ে আলোচনার আগে আনুসঙ্গিক অন্যান্য বিষয় নিয়ে অল্পবিস্তর আলোকপাত জরুরী।

বাজারে অনুবাদের অনেক চাহিদা থাকায় আজকাল অনেক ভূঁইফোড় অনুবাদক তৈরি হয়েছে। যারা ভিন্ন ভাষায় পর্যাপ্ত দক্ষ না হয়েও প্রতি বছর বইমেলার বৈচিত্র্য অনুবাদ গ্রন্থ প্রকাশ করে। তাদের ভাষা ও কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। আবার কখনো নকল অনুবাদও চোখে পড়ে। অনেক সময় অনেক আকর্ষনীয় সাহিত্যও অনুবাদকের অদক্ষতার কারণে পাঠকের মনে বিরুপ প্রতিকৃয়া তৈরি করতে পারে। একই সাহিত্য ভিন্ন ভিন্ন অনুবাদকের অনুবাদে অনেক পার্থক্য তৈরি হতে দেখা যায়। সে ক্ষেত্রে পাঠকের মনের মত অনুবাদ যিনি করতে পারেন তিনিই অনুবাদক হিসেবে সার্থক বলে বিবেচিত হয়ে থাকেন। আলোচ্য অনুবাদক সেই দিক বিবেচনায় কতটা সফল সেটা আমরা বুঝতে চেষ্টা করবো।

আমাদের বাংলা সাহিত্যের যে ইতিহাস সেখানে অনুবাদের উপস্থিতি মোটাদাগে বলার মত নয়।শুরুতে যদি আমরা কাফকার কথা টেনে আনি তাহলে দেখতে পাই গোটা পৃথিবী যখন কাফকা বন্দনায় মাতোয়ারা, আমরা তখন কাফকার নামগন্ধও জানতে পারিনি। এর মূলে রয়েছে অনুবাদের অনুপস্থিতি এবং অন্যান্য লেখক,সাহিত্যিকদের জানার কৌতুহলের অভাব। পৃথিবীর কোথায় কে কি লিখলো তার খোঁজ না রাখলে মূলত অনেক কালজয়ী সাহিত্যের স্বাদ পাওয়া থেকে বঞ্চিত হতে হয়। অনুবাদ সাহিত্যের ব্যাপক পরিচিত ও প্রচলনের অভাবেই মূলত কাফকা এদেশে প্রবেশ করেছে অনেক পরে আশির দশকে। সেই সময়ে বাংলা সাহিত্যে যারা যুক্ত ছিলেন তারা সচেষ্ট হলে কাফকার সাহিত্য আমাদের দেশে প্রবেশ করতো আরও অনেক আগে। অনেকের মতে এর আগেও কাফকা অনুদিত হয়েছে কিন্তু ভাষাগত ভাবে সেগুলো এতোটাই দুর্বল ছিলো যে পাঠকের মনে যায়গা করে নিতে পারেনি। শুধু কাফকাই নয় বরং বিশ্বের অপরাপর বিখ্যাত লেখক কবিদের লেখা বাংলা ভাষায় অনুবাদে আমাদের যে উদাসীনতা এবং এই যে দীর্ঘ বিলম্ব এর পেছনে অনেক কারণ থাকতে পারে। আলোচ্য অনুবাদক মাসরুর আরেফিন সেই ধারা থেকে বেরিয়ে এসে বাংলাভাষার পাঠকদের জন্য কাফকাকে সহজ ভাবে অনুবাদ করতে চেষ্টা করেছেন।

মাসরুর আরেফিন কিশোর কালে ক্যাডেট কলেজে পড়ালেখা করেছেন। কলেজে পা রাখার পর এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হলো তার সামনে।একদিন কলেজ লাইব্রেরীতে বই খুঁজতে গিয়ে চোখে পড়লো “ দ্য আউট সাইডার” গল্পটি। লেখক আলবেয়ার কামু। বিশ্ববিখ্যাত লেখক তিনি। এর আগে যদিও কিশোর মাসরুর আরেফিনের আলবেয়ার কামু নামে যে কোন লেখক আছেন তা জানা ছিলো না।ঘটনাটা ১৯৮৬ সালের। কিছুদিন আগেই ভর্তি হয়েছেন বরিশাল ক্যাডেট কলেজে।রুটিনমাফিক সব কিছু করতে হয়। প্রতিটি সেকেন্ডের যেখানে পাই পাই করে উশুল করতে না পারলে অবসরে করবো বলে সেই ফুসরত আর মেলে না।আলবেয়ার কামুর লেখা “ দ্য আউট সাইডার” গল্পটি একনাগাড়ে পড়তে পড়তেই শেষ হয়ে গেলো। বইটি ছিলো বাংলায় অনুদিত।সেই অনুবাদটি কলকাতা থেকে প্রকাশিত হয়েছিল।আউটসাইডার পড়তে গিয়ে ঘোর লাগা সময়ের মধ্যেই আরও একটি নাম চোখে পড়ে। ফ্রান্সৎস কাফকা! অদ্ভুত সুন্দর নাম। এর আগে এই নামটাও মাসরুর আরেফিনের জানা ছিলো না।আলবেয়ার কামু যে লেখক দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন সেই ফ্রানৎস কাফকাকে তো পড়তেই হবে। সংকল্পবদ্ধ হয়েছিলেন তিনি। কিন্তু আশ্চর্য হতে হলো যে কাফকার কোন বই বাংলাদেশে অনুবাদ পাওয়া প্রায় অসম্ভব ছিল। এভাবে অনুবাদ সাহিত্যের প্রতি একপ্রকার ভালোলাগা তৈরি হলো। পড়া হয়ে গেল আরও অনেক বিশ্বসাহিত্য। ১৯৯০ সাল। বরিশাল ক্যাডেট কলেজ থেকে পাশ করে সেই সাহিত্য প্রেমী মানুষটি তখন মুম্বাইতে, বোম্বে সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে। ওই সময় কোনো একটা লাইব্রেরিতে ফ্রানৎস কাফকার ”মেটামরফসিস অ্যান্ড আদার স্টোরিজ” বইটা তার চোখে পড়লো। দীর্ঘদিন যে লেখকের নাম বুকের মধ্যে লালন করেছেন সেই লেখকের বই সামনে পড়তেই আর দেরি না করে তা পড়ে ফেলেন।ততোদিনে কৈশর পেরিয়ে যৌবনের দ্বারপ্রান্তে তিনি এবং ঠিক ওই ‘রূপান্তর’ গল্পের প্রথম লাইনটা যেটা গার্সিয়া মার্কেজ এবং অনেক সাহিত্যিকের যেটা দিয়ে লেখালেখি শুরু: এক সকালে গ্রেগর সামসা ঘুম থেকে উঠে দেখে সে একটা পোকা হয়ে গেছে। ওই লাইনটি মাসরুর আরেফিনের মধ্যে একই অভিঘাত আনে। লেখকের ভাষায় ওটাই তার প্রথম পড়া কাফকা। তবে সেবার আর বাংলায় অনুদিত পড়া হয়নি বরং ওটা ছিলো ইংরেজীতে। পরবর্তী কালে তিনি বলেছেন তাঁর ধারণা  ‘রূপান্তর’ গল্পটাই কাফকার প্রথম গল্প যেটা তিনি পড়েছিলেন। এতো সুন্দর সব বিশ্ব সাহিত্য বাংলাভাষার পাঠকদের সামনে তুলে ধরার জন্য হৃদয়ের গভীর থেকে তিনি ডাক শুনতে পেলেন। কৈশর থেকে যৌবন পেরিয়ে এখন সুর্য মধ্যগগনে। সেই সাহিত্য প্রেমী মানুষটিও একে একে পার করেছেন অনেক বসন্ত। সেই সাথে হাত পাকিয়ে নিয়েছেন সাহিত্যের বেশ কিছু দিকে। যার মধ্যে অনুবাদ অন্যতম।

বিশ্বসাহিত্যে অনুবাদ ও রূপান্তরের বিরাট ভূমিকা অনস্বীকার্য। সাহিত্য ও কাব্যের ক্ষেত্রে অনুবাদ ও রূপান্তর অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়ে। আমাদের এই গ্রহে ভাষা ও উপভাষার পরিসংখ্যান দেওয়া দুরূহ, যেহেতু সংখ্যার দিক থেকে তা অগণিত। মহাকবি হোমার রচিত আদি মহাকাব্য ‘ইলিয়ড’ ও ‘ওডিসি’ প্রাচীন গ্রিক ভাষায় রচিত। আমরা আজকের পাঠকেরা তার এক বর্ণও বুঝতাম না, যদি গ্রন্থগুলো ইংরেজিতে অনূদিত না হতো। এ দুটো মহাকাব্য বাংলা ভাষায়ও অনূদিত হয়েছে। ‘মহাভারত’, ‘রামায়ণ’-এর মতো দুই মহাকাব্য যদি সংস্কৃত ভাষা থেকে বাংলায় অনূদিত না হতো, আধুনিক যুগের পাঠকরা এ দুই মহাগ্রন্থের কাছে ঘেঁষতেও পারত না। রাজশেখর বসু যে সহজ ও সংক্ষিপ্তভাবে আমাদের কাছে ‘মহাভারত’ গ্রন্থ হৃদয়গ্রাহী করে তুলেছেন, তার তুলনা বিরল। বুদ্ধদেব বসুর মতো বাংলা সাহিত্যের বহুপ্রভা লেখকের কল্যাণেই আমরা আজ বোদলেয়ার ও হোল্ডারলিনের কবিতা বাংলা ভাষায় পড়তে পারছি।

আমরা বাঙালিরা যেহেতু ইংরেজি পড়া, লেখা ও বোঝার মতো জানি, সমগ্র বিশ্বসাহিত্যের সঙ্গে আমাদের পরিচয় মূলত ইংরেজি ভাষার মাধ্যমে হয়ে থাকে। মওলানা রুমি, কাহ্‌লিল জিবরান ও ওমর খৈয়ামের অনন্য কাব্যপ্রতিভার সঙ্গে আমাদের পরিচয় ঘটেছে ইংরেজি ভাষার মাধ্যমেই। নিশ্চিতভাবে অনুবাদে মৌলিক ভাষার স্বাদ ও ধার অনেকটাই কমে যায়। কিন্তু দুধের স্বাদ ঘোলে মিটানো ছাড়া বিশ্বের সাহিত্যপ্রেমীদের আর কোনো উপায় থাকে না। এভাবে চায়নিজ, জাপানি, রাশিয়ান, জার্মান, স্প্যানিশ, ফরাসি, আরবি, ফারসি, উর্দুসহ বিশ্বের অগণিত ভাষা ও উপভাষার সঙ্গে আমাদের পরিচয় ঘটে ইংরেজি ভাষায় অনুবাদের মাধ্যমে।তবে এখন বেশ কিছু গুণী লেখক অনুবাদকের ভূমিকায় অবতীর্ন হয়ে মাতৃভাষায় বিদেশী সাহিত্যের স্বাদ পাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছেন। আমরা তেমনই একজন লেখক, কবি ও অনুবাদক মাসরুর আরেফিনের গল্প বলতে চাই।

২০১৯-এ আগস্ট আবছায়া এবং ২০২০-এ আলথুসার, বাংলাভাষায় সম্পূর্ণ নতুন স্বাদের এ-দুটি উপন্যাস লিখে সমকালীন বাংলা সাহিত্যে আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসা মাসরুর আরেফিন মূলত কবি। পড়াশোনা করেছেন ইংরেজি সাহিত্য এবং মার্কেটিং ও ফিন্যান্স-এ। ২০০১ সালে প্রথম কাব্যগ্রন্থ ”ঈশ্বরদী, মেয়র ও মিউলের গল্প” প্রকাশের পর তা বাংলা কবিতার পাঠককে দিয়েছিল নতুন কাব্যভাষার স্বাদ। বইটি সে বছর প্রথম আলোর নির্বাচিত বইয়ের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়। এরপর মৌলিক সাহিত্য রচনা থেকে দীর্ঘ একটা বিরতি নিয়ে তিনি ডুব দেন বিশ্বসাহিত্য অনুবাদের কাজে। অনেকেই মনে করেন অনুবাদ সাহিত্যে মাসরুর আরেফিনের অবদান বাংলাভাষাকে সমৃদ্ধ করেছে অনেক বেশি।এটি পাঠক মাত্রই তার অনুদিত গ্রন্থ পাঠের মাধ্যমে উপলব্ধি করতে পারবেন। তাঁর অনুবাদে ফ্রানৎস কাফকা গল্পসমগ্র (২০১৩) ব্র্যাক-সমকাল সাহিত্য পুরস্কার ও বাংলা একাডেমি-চিত্তরঞ্জন সাহা সেরা প্রকাশনা পুরস্কার লাভ করে। ২০১৫ সালে বেরোয় তাঁর হোমারের ”ইলিয়াড” এবং সমাদৃত হয় পাঠক মহলে। বিশ্ব সাহিত্যের বাঘা বাঘা লেখকের বই যেগুলো বাংলায় অনুদিত হয়েছে তার মধ্যে যা কিছু হাতে এসেছে তা তিনি মন্ত্রমুগ্ধের মত পড়েছেন এবং নতুন করে ভাবার অবকাশ মিলেছে।

১৯৯০ এর দিকে বিশ্বসাহিত্যের ভান্ডারে প্রবেশ করে তিনি এতোটাই মন্ত্রমুগ্ধ হন যে একই সময়ে সমান্তরাল ভাবে একাধিক লেখকের বই পড়তে শুরু করেন। সেই সময়ে তিনি একই সাথে কাজুও ইশিগুরোর লেখা “রিমেইনস অব দ্য ডে” এবং ফ্রানৎস কাফকার “ দ্য ট্রায়াল” ‍উপন্যাস দুটি প্যারালালি পড়তে শুরু করেন।

একজন সফল অনুবাদকের জন্য পড়া এবং মূল লেখকের মনের ভাব বুঝতে পারাটা ভীষন জরুরী। মাসরুর আরেফিন অনুবাদের ক্ষেত্রে প্রতিটি লেখাকে নিবিড় ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন এবং বুঝতে চেষ্টা করেছেন লেখক মুলত কোন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে লিখেছেন।নিজে একজন কথা সাহিত্যিক হওয়ায় আরেকজন কথাসাহিত্যিকের সাহিত্য ভাষা বুঝতে সুবিধা হয়েছে। যা কিছু সরল আসলে তা কি ততোটাই সরল কিছু বুঝানো হয়েছে নাকি আরও কিছু। অনেকটা হারুকি মুরাকামির নরওয়েজিয়ান উড লেখার অভিজ্ঞতার মত যিনি কাহিনীর বাস্তব রূপ নিজে আগে উপলব্ধি করেছেন এবং তার পর লিখেছেন যেন মূল অনুভুতিটা লেখার মধ্যে চিত্রায়িত হয়। অনুবাদক হিসেবে মাসরুর আরেফিন চেয়েছে পাঠক যেন অনুদিত বইটি পড়তে গিয়ে বার বার মনে করে এটি কোন অনুবাদ বই নয় বরং এটিই মূল লেখা।

বিখ্যাত লেখক হোর্হে লুই বোর্হেস মনে করেন কাফকার সেরা গল্প “গ্রেট ওয়আল অব চায়না”। আলোচ্য অনুবাদক মাসরুর আরেফিন এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন তিনি “গ্রেট ওয়াল অব চায়না” পড়েছেন নব্বইয়ের দশকে মুম্বাইতে বসে।এভাবে একটা শেষ করে আরেকটা,আরেকটা শেষ করে আরেকটা।কাফকা যেন মাসরুর আরেফিনকে নেশা ধরিয়ে দিয়েছিল যা পরবর্তী কালে তাকে কাফকার সাহিত্যকর্ম অনুবাদে সহায়তা করেছিল। ১৯৯২ সালে যখন তিনি পড়াশোনা করছেন সেই সময়েই এই গল্পটি পড়া এবং সেই সময়ে তিনি এতোটাই মুগ্ধ ছিলেন যে আগে অনুবাদের অভিজ্ঞতা না থাকলেও তিনি এটিকে অনুবাদ করতে শুরু করেন। সেই সময়ে তিনি ভারতে আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। অনুবাদগুলি ভালো হয়নি, উন্নত মানের অনুবাদ হয়নি তবুও আশা কথা হলো বেসিক অনুবাদ তো একই, বেসিক কাঠামো ঠিকই ছিলো।লেখক ও অনুবাদক মাসরুর আরেফিন মূলত যে বয়সে কাফকা,কামু পড়তে শুরু করেছিলেন ঠিক সেই সমসাময়িক সময়েই তিনি সেগুলো অনুবাদ করতে শুরু করেন।ফলে সেই সময়ে করা অনুবাদে কিছু দুর্বলতা চোখে পড়ে যা তিনি পরবর্তী সময়ে কাটিয়ে উঠেছেন।

পড়তে পড়তেই মাসরুর আরেফিন ‍বুঝতে পারলেন কাফকা আমাদেরকে এমন একটা সিরিয়াস টোনে গল্পগুলা বলে গেছেন যে, আমরাও এই ওয়াল্টার বেনজামিন,থিওডোর অ্যাডর্নো, জ্যাঁ পল সার্ত্রে থেকে শুরু করে সিরিয়াস লেখকদের ব্যাখ্যাতে কাফকা এমন এক সিরিয়াস রূপ নিয়ে নিয়েছে। বিশ্বব্যাপী চারদিকে কাফকার ডিকন্সট্রাকশন হচ্ছে। দেশে দেশে সাহিত্যিক,অনুবাদক,লেখক এবং শিল্পবোদ্ধারা ফ্রানৎস কাফকাকে অনেক দিক থেকে দেখার চেষ্টা করা হচ্ছে।যেটাকে বলা যেতে পারে ”ম্যাচিউরড ভিউ অব ফ্রানৎস কাফকা”। কাফকা কি আসলেই এত ডার্ক, কাফকা কি আসলেই এত প্রোফেটিক? এগুলো বুঝতে চেষ্টা করেছেন মাসরুর আরেফিন। এবং তার অনুবাদের ভূমিকা সহ অন্যান্য বিষয়ে লক্ষ্য করলে পাঠক সহজেই বুঝতে পারবেন একজন অনুবাদক হিসেবে মাসরুর আরেফিন কতটা পরিশ্রমী এবং নিষ্ঠাবান।

কাফকা অনুবাদ করতে গিয়ে মাসরুর আরেফিন অনেক ভাবে কাফকাকে পর্যবেক্ষণ করেছেন। তারুণ্যের উচ্ছ্বাস থেকে কাফকাকে দেখেছেন,পাশাপাশি একটা নিশ্চিত ব্যাখ্যার মধ্যে কাফকাকে দেখতে চেয়েছেন — মাসরুর আরেফিন বুঝতে পেরেছেন ফ্রানৎস কাফকা মানেই ”কাফকায়েস্ক”। অনুবাদক হিসেবে তিনি কাফকার হিউমারটা ধরতে পেরেছেন। আমরা দেখি অনেক অনুবাদক গৎবাধা অনুবাদ করে দায় সারেন এবং ফ্রানৎস কাফকার হিউমার বলতে যে কিছু আছে  তা অনেকেই বুঝতে পারেন না। কারণ সেটা বুঝতে হলে যতটা গভীর ভাবে তলিয়ে দেখতে হয় তা খুব কম অনুবাদকের আছে। কাফকাকে অনেকে মনে করে ভীতি, নৈরাজ্য, ভয়, আতঙ্ক, দুঃস্বপ্ন–ফ্রানৎস কাফকা মানেই তাই। আসলে কিন্তু সেটা নয়। মাসরুর আরেফিন এমন ভাবে অনুবাদে হাত দিয়েছেন যে লেখাটি মূলত বাংলাতেই লেখা হয়েছিল। পাঠককে টেনে ধরে তাঁর প্রতিটি অনুবাদ।

ফ্রানৎস কাফকার প্রথম অনুবাদক ছিলেন ইংরেজ দম্পতি উইলা অ্যান্ড এডুইন মুয়ির। ওই মুয়ির পড়া কাফকা এই পৃথিবীতে একটা জেনারেশনের কাফকা। তারপরে আরো অনেকগুলা কাফকা আসে ইংরেজি ভাষায়। যেমন ম্যালকম প্যাস্লির অনুবাদগুলা পাওয়া শুরু হয়, যেগুলাকে বলা হয় ডেফিনেটিভ এডিশন। যেমন এডুইন মুয়ির অ্যান্ড উইলা মুয়িরের অনুবাদে, তারা বিশ্বাস করত যে কাফকা ধর্মপ্রচারক, তারা বিশ্বাস করতেন যে কাফকার লেখা আধ্যাত্মিকতায় ভরা, স্পিরিচুয়াল রাইটিং। তাদের লেখাগুলার মধ্যে সবকিছু স্পিরিচুয়াল — যদি কাফকা লিখতেন একটা স্বচ্ছ আলো, ওনারা লিখতেন একটা অনির্বাণ দীপ্তি। পরে ম্যালকম প্যাস্লি,জে এ আন্ডারউড,আরন্স্ট্ কাইজার, এইথ্নে উইলকিনস, মাইকেল হফমান, মার্ক হারম্যান এদের অনুবাদগুলো আসতে থাকে পঁচানব্বই সালের পরের থেকে। মূলত এই সব অনুবাদ গ্রন্থে মূল কাফকার বেশ খানিকটা অনুপস্থিত থেকে গেছে। মাসরুর আরেফিন সেই অনুপস্থিত কাফকাকে সঠিক ভাবে উপস্থিত করতে চেষ্টা করেছেন।

মাসরুর আরেফিনের অন্যতম আরেকটি অনুবাদ কর্ম মহাকবি হোমারের মহাকাব্য “ইলিয়াড”। উদ্দেশ্যই ছিল এটার একটা আক্ষরিক একাডেমিক অনুবাদ করা, যাতে ইংরেজিতে যাদের যাতায়াত নেই, গ্রিক ভাষায় যাতায়াত নেই, তারা যেন এই অনুবাদটা হাতে নিয়ে বলতে পারেন_ এটাই হোমার। এর মধ্যে একটা শব্দও বাদ যায়নি, যেটা হোমারে আছে। শুধু ভাষার পরিবর্তনটা বাদ দিলে মনে হবে পাঠক খোদ নিজেই যেন উপস্থিত ছিলেন। ভাষার আভিজাত্যের সঙ্কীর্ণ বেড়াই যদি হয় ভাষান্তরের পক্ষে অন্যতম প্রতিবন্ধক, তা স্বীকার করে নিতে কোন অসুবিধা থাকে না। অনুবাদের সাথে মূলের প্রভেদ চিরকালই দেহরুপ বাইরের খোলসের সাথে অর্ন্তনিহিত আত্মার মতই। মাসরুর আরেফিনের অনুবাদের ক্ষেত্রে বিষয়টি কিছুটা ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়েছে বলে মনে হয়। তিনি অনুবাদে নিজস্ব স্বকীয়তা বজায় রেখেছেন ফলে তা হয়ে উঠেছে সুপাঠ্য। অনুবাদ কীভাবে হবে বা কতটুকু হওয়া সম্ভব এসব বিষয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আরোপিত নিজস্ব পরিভাষাটিও মাসরুর আরেফিনের অনুবাদে খুঁজে পাওয়া যায়। অনুবাদের মাধ্যমে এক ভাষার সাহিত্যের আস্বাদ বা আঘ্রাণ অন্য ভাষায় কখনোই সেভাবে পাওয়া যায় না। স্বভাবতই রসকষহীন অনুবাদ হয়ে দাঁড়ায় অনেকটা মরা বাছুরের মত। কিন্তু কখনো কখনো কোন কোন অনুবাদক তাদের জ্ঞানের গভীরতা ও পর্যবেক্ষনের গুণে তা কাটিয়ে উঠতে পারেন। সঠিক তাৎপর্য ধারণ করতে পারেন হৃদয়গত ভাবে। একজন পাঠক হিসেবে আমার মনে হয়েছে এই কাজটি খুব ভালোভাবে করতে পেরেছেন মাসরুর আরেফিন। তিনি সম্পুর্ন তাৎপর্য হৃদয়ে জাগ্রতে রেখেই অনুবাদের কাজে হাত দিয়েছেন। আর নিজের উপলব্ধির সবটুকু তিনি নিঃশেষ করে দিয়ে অনুবাদ করেছেন। 

ভাষা স্রোতের মতো, তা নিরন্তর পরিবর্তনশীল। মূল ভাষাকে সমৃদ্ধ করার জন্য আঞ্চলিক ভাষারও একটা ভূমিকা আছে। আঞ্চলিক ভাষার শব্দ, বাক্যবিন্যাস ও ঝঙ্কার মূল ভাষাকে সমৃদ্ধ করে। বর্তমানে, আমাদের দেশে বাংলা ভাষা কথন আধুনিকতার নামে নানা ভাবে নষ্ট হচ্ছে। আধুনিকতা ভাষায় বিকৃতি গ্রহণ করে না, ভাষার সুষমা ও উন্নতিই কেবল প্রত্যাশা করে। নিত্যদিনের আধুনিক বাক্‌চারিতায় প্রমিত ভাষার সঙ্গে আঞ্চলিক ভাষার মিশ্রণ শ্রুতিকটু হয়ে থাকে। অবশ্য বাচনিক ভাষায় শব্দ-নির্বাচন, উচ্চারণ, বাচনভঙ্গি, ধ্বনি ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ। অনেকেই অনুবাদের ক্ষেত্রে নিয়মের তোয়াক্কা না করে নিজের মত অনুবাদ করে থাকেন ফলে সাহিত্য তার নিজস্ব স্বকীয়তা যেমন হারায়, তেমনি পাঠকের কাছে তা হয়ে ওঠে দুর্বোধ্য। মাসরুর আরেফিনের অনুবাদে এই সব স্বকীয়তা ধরে রাখার চেষ্টা স্পষ্ট ভাবে ফুটে উঠেছে।

আমার সাথে হয়তো অনেকেই এক মত নাও হতে পারেন তবে অনুবাদকেরাও মূল লেখকের মতই উল্লেখযোগ্য। রজার বেকনের মতে অনুবাদের ক্ষেত্রে মূল ভাষা এবং অনুদিত ভাষা উভয়কেই গুরুত্ব দিতে হবে। প্রাচীন গ্রীক থেকে ল্যাটিন অনুবাদ এবং সমসাময়িক সাহিত্যের মাতৃভাষায় অনুবাদের মধ্যে পার্থক্য বিষয়ে বেকন যথেষ্ট সচেতন থাকতে বলেছেন। এমনকি এই একই বিষয়ে দান্তেও সহমত পোষণ করেছেন। ফলে ভালো অনুবাদের সাথে নৈতিক ও নান্দনিকতার দিকটি গুরুত্বপুর্ন। আর এ কারণেই মাসরুর আরেফিন তাঁর অনুবাদে সঠিক ভাবকে প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে নৈপুণ্য অর্জন করেছেন। অনুবাদকে নির্ভুল করতে হলে অনুবাদকের প্রয়োজন মূল লেখাটি ভালোভাবে পড়া ও তার নিহিতার্থ যথাযথ ভাবে উপলব্ধি করা। অর্থ অনুধাবন করতে পারলে তবেই কেবল তা সঠিক ভাবে অনুদিত হওয়া সম্ভব। কাফকার রচনা অনুবাদ কালে এবং হোমার অনুবাদ কালে মোটাদাগে বলতে গেলে সব সময় মাসরুর আরেফিন এই খুটিনাটি বিষয়গুলো মাথায় রেখেছেন।

অনেক পাঠক মনে করতেন বুদ্ধদেব বসু বোদলেয়ার অনুবাদের মাধ্যমে পরবর্তী বাংলা কবিতার জন্য যে অমিয় সম্ভাবনা তৈরি করেছিলেন, ঠিক তেমনি যদি তিনি বা তাঁর মত যোগ্য কেউ কাফকার অনুবাদ করতেন তাহলে বাংলা সাহিত্যের বহু বিচিত্র সম্ভাবনাকে নিশ্চিত করে তোলা যেত। যেমনটা হোর্হে লুই বোর্হেস স্প্যানিশ ভাষায় ফকনার এবং কাফকা অনুবাদের মাধ্যমে চল্লিশের দশকেই নিজের এবং পরবর্তী লেখক যেমন গ্যাবরিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ,মারিয়ো বার্গাস ইয়োশা বা কোর্তাসা প্রমুখদের জন্য সম্ভাবনার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত করেছিলেন। আশার কথা হলো আমাদের বাংলা সাহিত্যের অনেক লেখকের ধারনাকে উপেক্ষা করেই শেষ অব্দি কাফকা বাংলায় অনুদিত হয়েছে এবং মোটাদাগে এটিকে কোন ভাবেই কারো পক্ষে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। মাসরুর আরেফিন যে অনুবাদটি করেছেন তার গুরুত্ব বাংলাভাষার পাঠকদের কাছে যারপরনাই অবর্ননীয়।

গুরুত্বপুর্ন ব্যাপার হলো মাসরুর আরেফিন একাই কাফকাকে বাংলায় অনুবাদ করেন নি বরং কলকাতা থেকেও এটির একাধিক অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছে। ফলে কেউ চাইলেই মিলিয়ে দেখতে পারেন মাসরুর আরেফিনের অনুবাদ এবং কলকাতার অনুবাদের পার্থক্য,সাবলিলতা,মাধুর্য এবং গ্রহণযোগ্যতা কতটা। আর সেখানেই পাঠক খুব সহজেই উপলব্ধি করতে পারবেন অনুবাদক হিসেবে মাসরুর আরেফিন কতটা সফলতার পরিচয় দিয়েছেন। উদাহরণ স্বরুপ আমরা মনোজ চাকলাদারের কথা বলতে পারি। মনোজ চাকলাদার নামে এক অনুবাদক তার কাফকার অনুবাদ বইয়ে যে সূচনা বক্তব্য লিখেছেন সেখানেও বাক্য গঠনে অনেক অসংগতি আছে। দুঃখের ব্যাপার হলো যে কোন সাধারণ পাঠকও সেটি পড়তে গেলে  মনে হবে এই অনুবাদক অর্থাৎ মনোজ চাকলাদারের কাফকা সম্পর্কে তেমন ধারণাও অস্বচ্ছ। অন্যদিকে মাসরুর আরেফিন কাফকা নিজে পড়েছেন,উপলব্ধি করেছেন এবং গভীরতা অবলোকন করে তবেই অনুবাদ করেছেন। মাসরুর আরেফিনের বইয়ে তথ্যের প্রাচুর্য,অনুবাদের সততা এবং টীকা ভাষ্যের যে অপুর্ব সমাবেশ আমরা দেখতে পাই তা আরেফিনের অনুবাদ না পড়া অব্দি কাফকা প্রেমিক পাঠকেরা বুঝতে পারবে না। এইরকম দৃষ্টান্ত তারা আগে কখনো দেখেনি।

বিশ্বসাহিত্যের পরম্পরায় কাফকার সঠিক অবস্থানটিকে স্পষ্ট করে তোলার জন্য যে বিপুল পরিমান জ্ঞান আহরোণ করা প্রয়োজন তা তিনি করেছেন এবং নিষ্ঠার সাথে নিপুন ভাবে তা বিন্যস্ত করেছেন।অনুবাদকের জন্য দরকার অনেক বেশি সতর্কতা, যেন বিশ্বস্ততার মানদন্ডে মোটামুটিভাবে নির্ভরযোগ্য ইংরেজী অনুবাদের উপর ভরসা না করলে বাংলায় ভালো অনুবাদে কাফকাকে সঠিক ভাবে পাওয়া কঠিন। অনুবাদক হিসেবে মাসরুর আরেফিন এই দিকটিতে বেশ সতর্ক ভাবে পা ফেলেছেন। 

কলকাতার মনোজ চাকলাদার যেমন “মেটামরফোসিস” এর অনুবাদ এভাবে শুরু করেছেন- “ এক সকালে অস্বস্তিকর স্বপ্ন থেকে গ্রেগর সাসমা জেগে ওঠে,দেখে একটা বিরাট বড়ো পোকায় রুপান্তরিত হয়ে গেছে” ঠিক একই লেখা মাসরুর আরেফিন অনুবাদ করেছেন এভাবে “এক সকালে গ্রেগর সাসমা অস্বস্তিকর সব স্বপ্ন থেকে জেগে উঠে দেখে সে তার বিছানায় পড়ে আছে এক দৈত্যাকার পোকায় রুপান্তরিত হয়ে।” দুটি অনুবাদ দেখলেই পাঠক বুঝতে পারবে কোন অনুবাদটির পাঠযোগ্যতা বেশি।অনুবাদের ক্ষেত্রে সবগুলো অর্থকে শক্ত বাধঁনে বেঁধে একটি পুর্ণাঙ্গা বাক্য গঠনের মাধ্যমে এক অপুর্ব সৌন্দর্য সৃষ্টি করতে হয়, যা মাসরুর আরেফিন করতে পেরেছেন।

কাফকা অনুবাদের পর মাসরুর আরেফিন চেয়েছিলেন হোমার অনুবাদ করতে। তবে নানা কারণে তা দেরি হয়েছে। ১৯৯২-৯৩ সালে স্যাঁ-ঝন পের্সের আনাবাজ অনুবাদ করছিলেন যা পরবর্তীতে ‘মাটি’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। আনাবাজ অনুবাদ করতে গিয়ে তিনি দেখেছেন সেখানে ট্রয় শহরের প্রসঙ্গ আছে।লেখক ও অনুবাদক মাসরুর আরেফিন এক আলাপচারিতায় এ নিয়ে কথা বলেছিলেন। তাঁর মতে ওই প্রসঙ্গটা এমন ভয়ংকর ছিল যে,নদীতে মৃত গাধার শরীর ভেসে যাচ্ছে। ‘আনাবাজ’ কবিতার সেই নদীর নামটা বের করতে গিয়ে তিনি খুঁজে পেলেন স্যাঁ-ঝন্ পের্স কবিতায় যে ইলিয়ন শহরের কথা বলছে, সেই ইলিয়ন হচ্ছে ট্রয় শহরের আরেক নাম। তখন ট্রয় জানতে গিয়ে জানলেন হেলেনের কথা, ট্রয়ের যুদ্ধের কথা। এসব পড়তে পড়তে আটকে গেলেন। অন্য সবার মতোই ট্রয়ের যুদ্ধ সম্পর্কে পড়া তো ছিলই, কিন্তু সেই তখন থেকে একেবারে পূর্ণ মনোযোগে পড়া শুরু করলেন। 

পাঠক সাধারণত অল্প বয়সে তথা সপ্তম-অষ্টম শ্রেণীর দিকে ট্রয়ের যুদ্ধ, হেলেন কিংবা হেক্টর, একিলিসের কথা পড়ে থাকে। কিন্তু সেটা অনেকটা রোমাঞ্চ কাহিনী পড়ার মতো করে পড়া। মাসরুর আরেফিন গভীরভাবে হোমারের জগতে ঢুকলেন ‘৯২-৯৩ সালের দিকে। তখন থেকেই আগ্রহ তৈরি হয় এবং সিদ্ধান্ত নেন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ দুই মহাকাব্য ”ইলিয়াড” এবং ”ওডিসি” একদিন বাংলা অনুবাদ করবেন। আগ্রহটা ভেতরে ভেতরে ছিল। আর কাফকা অনুবাদ করে ফেলার পর মনে হলো, একই জিনিস আবার না করতে। অনুবাদকের ভাষায় ”অনেকটা একঘেয়ে লাগছিল কাফকায় হাত দিতে”। ঠিক তখনই ইলিয়াড-এর অনুবাদে হাত দিলেন এবং দু’বছরের মধ্যে অনুবাদ কাজটা শেষ করে ফেললেন। বাংলায় তখন পর্যন্ত এসব বিখ্যাত কাজের প্রামাণ্য কোনো অনুবাদ হয়নি। আগে যে অনুবাদগুলো হয়েছে তা অনেকটা সংক্ষেপিত কিংবা ভাবানুবাদ। অবশ্য সেগুলো থেকেও পাঠকদের আগ্রহ বাড়ে। পড়তে সহজবোধ্য হয়। বাংলার সামাজিক-সাংস্কৃতিক ভাবধারায় সেটাকে ফুটিয়ে তুললে মানুষের কাছে সহজে বোধগম্য হয়। হোমারের প্রতি কিংবা ট্রয় ও হেলেনের প্রতি সাধারণ পাঠকদের আগ্রহী করে তোলে।

এসব অনুবাদের ভূমিকা বিরাট। কিন্তু এখানে একটা ত্রুটি থেকে যায় যে সেই সময় অব্দি, একটা প্রামাণ্য হোমার কিংবা আদর্শ একটা হোমার বাংলায় হয়নি। যেটা কিনা লাইন বাই লাইন ধরে ধরে করা। সেটা হয়তো একটু কম পাঠকপ্রিয় হতে পারে, কিংবা রোমাঞ্চ কাহিনীর মতো পড়তে আনন্দ নাও লাগতে পারে। কিন্তু মাসরুর আরেফিন সেটা করেছেন। এটি একটি আক্ষরিক একাডেমিক অনুবাদ, যেখানে ইংরেজিতে যাদের যাতায়াত নেই, গ্রিক ভাষায় যাতায়াত নেই, তারা এই অনুবাদটা হাতে নিয়ে বলতে পারবেন এটাই হোমার। এর মধ্যে একটা শব্দও বাদ যায়নি, যেটা হোমারে আছে। শুধু ভাষার পরিবর্তনটা বাদ দিলে পাঠকের মেনে হবে যেন মূল হোমারই বাংলায় পড়ছেন। অনুবাদক হিসেবে মাসরুর আরেফিনের এটা একটা বড় সাফল্য এবং গর্বের স্থান হয়ে আছে যে তিনি আক্ষরিক ভাবে হোমারকে বাংলাভাষার পাঠকের দোড়গোড়ায় পৌছে দিয়েছেন।

পাঠক যখন মাসরুর আরেফিনের অনুদিত কাফকা এবং ইলিয়াড পড়বে তখন মনে হতে পারে কাফকার চেয়ে ইলিয়াডের প্রতি বোধহয় লেখকের ব্যক্তিগত টানটা বেশিই ছিল। আর সে কারণেই কাফকার অনুবাদের চেয়ে ইলিয়াডের অনুবাদ নিঁখুত হয়েছে, এবং পাঠক মাত্রই বুঝতে পারবে এটি অনুবাদের ক্ষেত্রে অনুবাদক সর্বোচ্চ দিয়ে চেষ্টা করেছেন। আরেফিনের অনুবাদের সাবলিলতার কারণে বাঙালি পাঠকমাত্রই ”ইলিয়াড” উপভোগ করবে। 

মাসরুর আরেফিন যেন কেবলমাত্র ইলিয়াডটাই অনুবাদ করেন নি বরং বইয়ের শুরু, ভূমিকায় নানাভাবে বিষয়টাকে খোলাসা করার চেষ্টা করেছেন, যেন পাঠক খুব সহজেই কাহিনীতে ঢুকতে পারে। একটি নির্দিষ্ট বিষয়ের রাজনৈতিক ব্যাখ্যা, পৌরাণিক ব্যাখ্যা রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। হঠাৎ ইলিয়াডে ঢুকতে গেলে যে কোনো পাঠকের জন্যই বিষয়টি কঠিন হয়ে যেতো যদি না এই ব্যাখ্যা না রাখা হতো। প্রধান চরিত্রগুলোর নামে একটা অংশ রাখা হয়েছে,যেন হাজারেরও বেশি নামের মধ্যে গুলিয়ে গেলে  সেখান থেকে উদ্ধার করা যায়। মাসরুর আরেফিনের ইলিয়াডের অনুবাদটা মূল হোমারের ইলিয়াডের লাইনের হুবহু রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। যে পর্বে যেখানে যে লাইন আছে, অনুদিত গ্রন্থে সেভাবেই রাখা হয়েছে। যা পাঠকের জন্য সুবিধাজনক হয়েছে। এসবই বাঙালি পাঠকদের মধ্যে ইলিয়াডকে সহজগম্য করে তুলে ধরবে। সবকিছু মিলিয়ে মাসরুর আরেফিন অনুদিত ইলিয়াড একটা সম্পূর্ণ সফল অনুবাদ বই হিসেবে অনায়াসে গ্রহণযোগ্যতা পাবে।

আমাদের দেশে গভীর অনুধ্যান নিয়ে এ রকম পরিশ্রমী কাজ খুব একটা হয় না। একটা দেশের শিল্প-সাহিত্যের অগ্রগতির জন্য কেবল অনুবাদ নয়, যে কোনো ক্ষেত্রেই প্রতিশ্রুতিশীল কাজের প্রয়োজন রয়েছে। এ ধরনের কাজ যে কোনো দেশের সাহিত্যকেই আরও ঋদ্ধ করে। ফলে মাসরুর আরেফিনকে বাংলাভাষার পাঠকেরা ধন্যবাদ জানাতেই পারে তাঁর এই দারুণ কাজের স্বীকৃতি স্বরুপ।

মাসরুর আরেফিন একাধারে কবি,কথাসাহিত্যিক এবং অনুবাদক। তিনি এই তিন ভূমিকাতেই যথেষ্ট সক্রিয়তা বজায় রেখেছেন। তিনি অনুবাদ করতে যেমন ভালোবাসেন, তেমনি ভালোবাসেন কবিতা লিখতে, এবং মৌলিক রচনা লিখতেও তিনি সিদ্ধহস্ত।

মাসরুর আরেফিনের লেখার সাথে পরিচয় হয় কাফকার গল্পের অনুবাদ দিয়েই । মাঝে মাঝে খটমটে আবহাওয়ার অনুবাদ মনে হলেও পাঠ পর্যালোচনা আর টীকা-ভাষ্যগুলো ছিল অসাধারণ । পড়ে একজন ঋগ্ধ এবং একনিষ্ঠ পাঠকের পরিচয় পেয়েছিলাম । কাফকার প্রতি লেখকের যে আবেগ তা আমকেও ছুঁয়ে গিয়েছিল । মূলত প্রথমদিকের অনুবাদ বলেই হয়তো এটি হয়েছে যা তিনি তার পরবর্তী কাজগুলোতে পুষিয়ে নিয়েছেন।

বাক্যের সৌন্দর্য,সাবলিলতা,নির্ভুলতা এবং বিশ্বস্ততার প্রশ্নে তিনি পাঠককে চমৎকৃত করতে পেরেছেন। নিখুত ভাবে কিছুই বর্জন করছেন না আবার মনগড়া কিছুও জুড়ে দেন নি। তিনি অনুবাদের সুবিধার্থে গ্রীক ভাষা অব্দি শিখেছেন বলে এক আলোচনায় জানিয়েছিলেন। পাশাপাশি ইংরেজী অনুবাদের সব থেকে সেরাটা বেছে নিয়েছেন। অনুবাদের ক্ষেত্রে বর্ণনা কৌশল,ভাষার পরিমিতি,বাচনভঙ্গি সব মিলিয়ে মাসরুর আরেফিন তা বেশ ভালোভাবেই বাংলা ভাষায় উপহার দিয়েছেন। প্রকৃত অর্থে মাসরুর আরেফিনের এই অনুবাদগুলির আগে যে সব অনুবাদ আমরা দেখি তার সাথে তুলনামূলক পর্যালোচনা করতে গেলে মাসরুর আরেফিনের অনুবাদ সাবলিল এবং প্রাঞ্জল যা পাঠকের হৃদয়গ্রাহী হবে এতে কোন সন্দেহ নেই।পরিশেষে একজন সাধারণ পাঠক হিসেবে অনুবাদক মাসরুর আরেফিনকে মূল্যায়ণ করতে গেলে নির্দ্বিধায় বলা যায় অনুবাদক হিসেবে তিনি তার সেরাটাই ঢেলে দিয়েছেন এবং তিনি এ ক্ষেত্রে পুর্ববর্তী অনেক অনুবাদকের চেয়ে অপেক্ষাকৃত বেশি সফল হয়েছেন।আমরা পাঠক মাত্রই আশা করি তাঁর হাত ধরে বিশ্ব সাহিত্যের আরও গুরুত্বপুর্ন অনেক লেখা বাংলায় অনুদিত হবে।

— জাজাফী

17 আগষ্ট 2020