চিকিদের দুঃসময়ের গল্প

জন্মের পর চিকি ওর মা বাবাকে দেখেনি। ওর জন্মের এক সপ্তাহ আগে ওর বাবাকে মেরে ফেলা হয়েছিল। যেদিন চিকির জন্ম হল সেদিনই ওর মাকেও খুন করা হল। চিকি এসব জানতো না। ও যখন একটু বড় হল তখনই এসব জানতে পারলো। দুটো কোমল হাত সব সময় চিকিকে আগলে রাখতো। হাত দুটো ফারহানার।ফারহানা এমআইটিতে পড়ে। ভার্সিটি বাদে বাকি সময়ে ওর সাবর্ক্ষনিক সাথী চিকি। চিকিও ফারহানার আদর পেয়ে দুঃখ ভুলে যেতে চেষ্টা করে কিন্তু বাবা মা পুবর্পুরুষদের মুত্যুর কথা চিন্তা করে তার খুব জিদ চেপে যায়। মা বাবার খুনের প্রতিশোধ নিতে চায়। কিন্তু চিকি অনেক ছোট। সে এই বয়সে হত্যার প্রতিশোধ নিতে পারবে না। ফারহানার কাছ থেকে সে খুনী সম্পর্কে সব শুনেছে।

আমেরিকার নিউজার্সিতেই থাকে খুনিটা। শুধু যে চিকির বাবা মা দাদা দাদিকে সে খুন করেছে এমন নয়। সেই খুনীটা আরও বহু খুন করেছে। খুন করে সে ডলার কামিয়েছে এবং ধনী থেকে আরে ধনী হচ্ছে।চিকি এর প্রতিশোধ নিতে চায়।শুধুমাত্র একটু বড় হওয়ার অপেক্ষা।বাবা মায়ের হত্যার প্রতিশোধ সে নেবেই নেবে।তবে সে লোকটাকে খুন করবেনা। সে তার চোখ দুটো তুলে নেবে। অন্ধ হয়ে বাকি জীবন সে বেঁচে থাকুক এবং কষ্ট পাক এটাই চিকির ইচ্ছা।চিকি সেটা ফারহানাকে বলেছে।বুদ্ধিটা ফারহানারও বেশ পছন্দ হয়েছে।

ফারহানা থাকে ম্যানহাটনে। ওখান থেকে নিউজার্সি বেশ দূরে। কিন্তু চিকির বাবা মার খুনের বদলা নিতে দরকার হলে পৃথিবীর একপ্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যেতে রাজি আছে চিকি।গুগল ম্যাপ থেকে ফারহানা ওকে রাস্তা দেখিয়েছে।এভাবেই পরিকল্পনা করতে করতে চিকি বেশ বড় হলো। তার বিয়ে হলো এবং কয়েকটা বাচ্চাও হলো।যেহেতু চিকির একটা পরিবার হয়েছে এবার সে প্রতিশোধ নিতে বের হতে পারবে। ফারহানা ততোদিনে এমআইটি থেকে পড়াশোনা শেষ করে বাংলাদেশে ফিরে গেছে।চিকি তাই ফারহানাকে বলতে পারেনি এবার সে প্রতিশোধ নিতে বের হচ্ছে।

এক সকালে পরিবারের সবাইকে ডেকে বাবা মা দাদা দাদির হত্যাকারির কথা বলেছে। তখন সে জানতে পারলো চিকির শ্বশুরকেও হত্যা করা হয়েছে।রাগ তার আরো দ্বিগুন হলো। পরদিন সে হত্যার প্রতিশোধ নিতে বেরিয়ে গেল। বাসার সামনেই একটা লরি দাড়িয়ে ছিল। সে লুকিয়ে সেটাতে উঠে পড়লো। লরিতে লেখা ছিল ম্যানহাটন টু নিউজার্সি। সুতরাং বিনা দ্বিধায় চিকি লরিতে উঠে লুকিয়ে থাকলো। কতক্ষণ গাড়ি চললো সে জানেনা। এক সময় গাড়িটা থেমে গেল।শুনতে পেলো ড্রাইভার তার হেল্পারকে বলছে নিউজার্সি চলে এসেছি সব আনলোড করো। চিকি যখন বের হবে তখন দেখলো লরিতে সাজানো কার্টনগুলোর একটার ডালা খুলে গেছে। ভিতরে কি আছে তা দেখার জন্য চিকি যখন উকি দিল তখন তার গা শিউরে উঠলো। সেটার ভিতরে ওরই জাত ভাইয়ের মৃত দেহ।

তার মানে চিকি যে খুনীটাকে খুঁজছে এই গাড়িটাও তারই। না জানে কত মায়ের কোল প্রতিদিন খালি হচ্ছে। বুড়ো খুনীটাকে শায়েস্তা করতে না পারলে এই হত্যাকান্ড থামবেনা। মনটাকে শক্ত করে চিকি বের হলো। ওকে দেখে ফেললো লরির ড্রাইভার এবং হেল্পার। তবে তেড়ে না এসে উল্টো বাবাগো মাগো ভুত ভুত বলে চেচাতে চেচাতে পালিয়ে গেল। তারা ভেবেছে কি করে এতোগুলো মৃতদেহের মধ্য থেকে একটা জীবিত বেরিয়ে এসেছে।এটা ভুত ছাড়া কিছু নয়।

এতে অবশ্য চিকির সুবিধা হলো।প্রথম দফায় বিপদে পড়তে গিয়েও বেঁচে গেল।গাড়ি থেকে নেমে সে সামনে তাকিয়ে দেখলো বিল্ডিংয়ের সামনে বুড়ো খুনীটার বিশাল একটা মুর্তি সেখানে নিচেয় বুড়োর নাম লেখা।ফারহানা আগেই গুগল থেকে বুড়োটার ছবি দেখিয়েছিল তাই নাম লেখা না থাকলেও তাকে চিনতে চিকির অসুবিধা হত না।চিকির ইচ্ছে হচ্ছিল ওটাকেই সবার আগে ভেঙ্গে গুড়িয়ে দেবে কিন্তু ভারি পাথরে তৈরি মুর্তি ভাঙ্গা চিকির পক্ষে সম্ভব নয়। সে খুব সাবধানে বুদ্ধি করে খুনীটার বাড়িতে ঢুকলো। খুঁজে খুঁজে তার ঘরটাও পেয়ে গেল। চিকির মনটা খারাপ হয়ে গেল। দরজার পাশে খুনী বুড়োটার একটা বড় ছবি বাঁধাই করা আছে।সেখানে যা লেখা ছিল তা থেকে চিকি জানতে পারলো বুড়োটা এক বছর আগেই মারা গেছে।

এক বছর হলো ফারহানা বাংলাদেশে চলে গেছে। এই এক বছরে চিকি তাই নতুন কোন সংবাদ জানতে পারেনি।এতো কষ্ট করে প্রতিশোধ নিতে এসেও তার প্রতিশোধ নেওয়া হলোনা। সে আবার অন্য একটা গাড়িতে করে ফিরে গেল ম্যানহাটনে।তাকে বিমর্ষ দেখাচ্ছিল। বাচ্চাকাচ্চা তাকে ঘিরে ধরে জানতে চাইলো প্রতিশোধের কথা। চিকি বললো খুনী বুড়োটা এক বছর আগেই মারা গেছে। একথা শুনে চিকি বাদে বাকি সবাই খুব খুশি হয়ে চিৎকার করে উঠলো। কিন্তু চিকি তখনো বিমর্ষ।তার স্ত্রী জানতে চাইলো খুনী বুড়োটা মারা গেছে এটাতো ভাল কথা। আর কাউকে সে খুন করতে পারবেনা। আমরা নিরাপদে থাকবো। চিকি বললো বুড়ো স্যান্ডার্স মারা যাওয়ার আগেই সারা পৃথিবীতে লাখ লাখ খুনীর জন্ম দিয়ে গেছে। সেই সব খুনীরা এখনো প্রতিদিন লাখ লাখ মুরগী মেরে ফেলছে তার পর সেগুলো ফ্রাই করে ক্যান্টাকি ফ্রাইডচিকেন নাম দিয়ে বিক্রি করে কোটি কোটি ডলার আয় করছে। আমাদের মত চিকিদের দুঃখ বুঝি কোন দিন শেষ হবেনা।

ম্যানহাটনে ফারহানা যে বাড়িতে থাকতো সেই বাড়ির মালিকের ছিল বিশাল একটি মুরগীর ফার্ম।চিকির জন্ম সেখানেই।ফারহানা থাকাকালিন নিজ হাতে সে মুরগীগুলোকে খাবার দিত আর তখনই চিকি নামের ছোট্ট একটি মোরগের বাচ্চার সাথে ভাল সম্পর্ক হয়েছিল। সে চলে যাবার পর সেভাবে কেউ আর চিকিদের আদর করতো না।বুড়ো স্যান্ডার্স মারা যাবার পরও তাই তাদের মুত্যু ভয় কাটছেনা।সে পরিবারের সবাইকে কাছে ডেকে বলেছে যে কোন সময় ঘাতক হানা দিতে পারে। খুনীদের হাত থেকে তারা কেউ রেহাই পাবেনা। কিন্তু কিছুটা সাবধানে থাকতে পারলে হয়তো আরো কটাদিন বেঁচে থাকা যাবে।

পরদিন সকালে দুটো লম্বা হাত এসে খপ করে চিকির গলা চেপে ধরলো। চিকির নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল।পরিবারের কথা যেমন মনে পড়ছিল তেমনি মনে পড়ছিল ফারহানার কথাও। কিছুক্ষণ পর একটা ধারালো চুরি দেহ থেকে চিকির মাথাটা আলাদা করে দিল। তার পর সব অন্ধকার। চিকি আজীবনের মত ঘুমিয়ে গেল।

৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭

 

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.