যে জীবন ফড়িং এর

0
60

কখনো ভাবিনি এমন দিন আসবে। এরচেয়ে ঢের ভালো ছিল আমাদের শিশুকাল। অভাব বলে তেমন কিছু চোখে দেখিনি।দিন দিন এ সমাজে টিকে থাকা দায় হয়ে পড়েছে। আমি হয়তো বড় মানুষ বিধায় খেয়ে না খেয়ে কোনো মতে দিন কাটিয়ে দিতে পারবো কিন্তু আমার দুধের শিশুর কী হবে? তারতো আমার মত সহ্য ক্ষমতা নেই। তার যখন দুধ প্রয়োজন তখন তা তাকে না দিলে এই শিশুটি অকালে ঝরে যাবে। বউয়ের মুখের দিকে তাকানো যায় না। তবুও সে উপলব্ধি করে যে আমার সাধ্যের মধ্যে সবটুকু দিয়ে সংসারের হাল ধরতে চেষ্টা করি। মতিঝিলের একটি অফিসে অফিস সহকারি হিসেবে কাজ করি। বেতন মোটে আট হাজার টাকা। তাও বেশ চলছিল কিন্তু হঠাৎ করে দ্রব্যমূল্য বাড়তে থাকায় এই টাকায় কিছুই হয় না। বউ বার বার করে বলে তুমি অফিসে বসকে বলো বেতন বাড়াতে। আমার আর সাহসে কুলায় না। কিন্তু এভাবেওতো চলা যায় না। ফলে একদিন সিদ্ধান্ত নিই বসকে যে করেই হোক বেতন বাড়ানোর কথা বলবো।

সামনেই কোরবানীর ঈদের ছুটি হবে। ছুটির আগে বসদের মন মেজাজ ভালো থাকে।এমন একটি উপলক্ষ্যকে কেন্দ্র করে এক বিকেলে বসের মতিগতি বুঝে তার রুমে ঢুকলাম। বস জানতে চাইলেন কী জয়নাল আবেদীন কী খবর আপনার। আমি বললাম স্যার আছি কোনো মতে বেচেবর্তে। জিনিসপত্রের যে হারে দাম বাড়ছে তাতে বেঁচে আছি এইতো অনেক বড়। বস বললেন সেটা অবশ্য ঠিকই বলেছেন। আমি মুখ কাচুমাচু করে দাড়িয়ে থাকলাম। ইতস্থ করছি বলবো কি বলবো না। বস মনে হয় বিষয়টা বুঝলেন। তিনি জানতে চাইলেন জয়নাল আবেদীন কিছু বলবেন? আমি বললাম স্যার বলতে তো চাই আবার সাহস হয়না। বস আমাকে অভয় দিয়ে বললেন এতোদিন কাজ করেন এই অফিসে আমাকে বলতে ভয় কিসে। বলুন। আমি বসের কথায় কিছুটা সাহস পেয়ে বললাম

স্যার, আমার বেতন বাড়ান। যে বেতন পাই তা দিয়ে কোনো ভাবেই আর সংসার চলছে না। না খেয়ে বিনা চিকিৎসায় মারা যাবো মনে হচ্ছে। বস আমার কথা শুনলেন এবং কিছুক্ষণ ভাবলেন। তার পর বললেন জয়নাল আবেদীন আপনার বিষয়টা আমি বুঝি তবে বেতন বাড়ানো কোনো ভাবেই সম্ভব হচ্ছে না। আপনি নিশ্চই জানেন অফিসের অবস্থা। আমি বললাম স্যার তাহলে আগামীকাল থেকে আমাকে বিকাল ৫ টার পর ছুটি দিয়ে দিন। আমার বড় উপকার হবে। বস জানতে চাইলেন বিকেল পাঁচটায় ছুটি নিয়ে কী করবেন? আমি লজ্জায় মাথা নিচু করে বললাম বউ বাচ্চার মুখের দিকে তাকানো যায় না। কতদিন ভালো কাপড় ভালো খাবার কিনে দিতে পারিনা। ঘর ভাড়া দিতেই পুরো মাসের বেতনের তিন ভাগের দুই ভাগ চলে যায়। বাকি টাকায় আর কিইবা করা যায়। যেহেতু বেতন বাড়াতে পারবেন না সেহেতু পাচটার মধ্যে ছুটি দিলে আমি সন্ধ্যা থেকে মধ্যরাত পযন্র্ত অটো রিকশা চালাবো। তাতে যা আয় হবে তা দিয়ে সংসারের বাকি খরচ চালাতে পারবো। স্যার দয়া করে এই আর্জিটা অন্তত রাখুন।

বস দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। বললেন ঠিক আছে দেখি তোমাকে ছুটি দিতে পারি কি না। বসকে ধন্যবাদ দিয়ে বসের রুম থেকে বেরিয়ে আসলাম। শেষ বিকেলে অন্তত কিছুটা হলেও প্রশান্তি লাগছিল। অফিস শেষে বস যখন বের হচ্ছিলেন আমি তখন রাস্তায় বাসের অপেক্ষায়। বস আমার পাশে এসে দাড়িয়ে বললেন জয়নাল আবেদীন  আপনি যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ভালো করেছেন। তবে মধ্যরাতে যদি অটো চালাতে চালাতে ক্ষুধা লেগে যায় তাহলে সোজা কমলাপুর রেলস্টেশনের দক্ষিণ পাশে চলে আসবেন। আমি বসের এই কথার কিছুই বুঝলাম না। আগ্রহ নিয়ে জানতে চাইলাম স্যার খাওয়ার জন্য ওখানে যাবো কেন? বস তখন বললেন মধ্যরাতে আমি ওখানে পরাটা আর ডাল ভাজি বিক্রি করি। আমারওতো সংসার আছে।

এটুকু বলেই বস বেরিয়ে গেলেন। আমাদের অফিসের কোনো গাড়ি নেই। সুতরাং বস হলেও তাকে পাবলিক সার্ভিস বাসেই উঠতে হয়। আমি বসের চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকলাম। একটু আগে বস যেটা বললেন সেটা সত্যি না মিথ্যা বুঝে উঠতে পারলাম না। অবশ্য সত্যি না হওয়ার কোনো কারণও দেখতে পেলাম না। তিনি যে বেতন পান তার লেভেল অনুযায়ী  জীবনযাপন করতে তিনিও ঠিক আমার মতই হিমশিম খাচ্ছেন। কাছেই কোনো একটি মসজিদ থেকে এশার আজান ভেসে আসছে। অফিস ফেরত ক্লান্ত মানুষগুলি এই শহরের জ্যাম ঠেলে বাসায় প্রিয়জনের কাছে যাওয়ার জন্য আমারই মত গাড়ির অপেক্ষায় আছে। ঘন্টার পর ঘন্টা জ্যামের যন্ত্রণা সহ্য করেও যখন প্রিয়জনের সান্নিধ্য পাই সব ভুলে যাই। কিন্তু ঘুম আর আসে না। এই শহর ক্রমে ক্রমে বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠছে আর দ্রব্যমূল্য যেভাবে বাড়ছে তাতে মনে হয় একদিন পুরো দেশে হাহাকার উঠবে। সেই শব্দ সহ্য করার মত মানসিক শক্তি কি আমাদের আছে?

– জাজাফী

8 মে 2017