Sunday, July 25, 2021
Homeপ্রবন্ধসন্তানের ভবিষ্যত নিয়ে আমরা কতটা ভাবছি?

সন্তানের ভবিষ্যত নিয়ে আমরা কতটা ভাবছি?

 

সন্তানের ভবিষ্যত নিয়ে সব বাবা মাই চিন্তামগ্ন থাকে।কিন্তু আমার মনে হয় সন্তানের ভবিষ্যতের চেয়ে আজকালকার বাবা মায়েরা নিজেদের কথাই বেশি ভাবে।যদিও আমি জানি এবং বিশ্বাস করি আমার এই কথার সাথে এদেশের নিরানব্বই ভাগ মানুষই একমত হতে পারবেনা।আজকালকার বাবা মায়েরা সন্তানকে দামী স্কুল,সেরা শিক্ষকের কাছে পড়াতে পিছপা হননা তার একমাত্র কারণ কিন্তু সন্তানের ভবিষ্যত নয়।এর পিছনে আরো অনেক কারণ আছে সেগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো সমাজে নিজেদের স্ট্যাটাস ঠিক রাখা।

যেন পাশের বাসার ভাবি বলতে না পারেন আমার বাচ্চা দেশ সেরা স্কুলে পড়ে আপনার বাচ্চা কোথায় পড়ে?এর বাইরে আরো যে কারণ আছে তা হলো সেরা স্কুল কলেজে পড়লে বাচ্চার ভবিষ্যত বেশি উজ্জল হবে ফলে সে ভাল ভার্সিটিতে পড়াশোনা করে বেশি বেতনের চাকরি করবে।বৃদ্ধ বয়সে তারা সন্তানের সাথে খুব আরামে কাটাতে পারবে।কোন কোন বাবা মা সন্তানের নিজস্ব স্বপ্নকে গলাটিপে হত্যা করে তার উপর চাপিয়ে দেয় নিজেদের অপুরনীয় স্বপ্ন।

হয়তো বাবা মা নিজেরা ডাক্তার হতে চেয়েছিলেন কিন্তু পারেননি এখন তারা স্বপ্ন দেখেন তাদের সন্তান ডাক্তার হবে। সে অনুযায়ি নানা ভাবে সন্তানকে চাপ দিতে থাকেন। ফলে সন্তানের ইঞ্জিনিয়ার বা ক্রিকেটার বা শিক্ষক যা হওয়ার স্বপ্ন ছিল তা নিমিশে মাটি চাপা পড়ে যায়। এভাবে না জানি এদেশের কত ছেলে মেয়ের নিজের স্বপ্ন নিজের অজান্তেই কোরবানী হয়ে গেছে।আমি যা বলছি এটা একান্তই আমার ভাবনা থেকে বলছি।আমি বিশ্বাস করি এই কথার সাথে অধিকাংশই একমত হবেনা।

বাংলাদেশের সেই সব অভিভাবকদের কাছে আমাদের প্রশ্ন যারা সন্তানদের দেশ সেরা স্কুল কলেজে ভর্তি করানোর জন্য সকাল সন্ধ্যা সন্তানের উপর বইয়ের বোঝা চাপিয়ে দিয়েছেন এবং কেউ কেউ মোটা অংকের ডোনেশান দিয়েছেন আপনারা কি বলতে পারেন যদি নামি দামি সেই সব স্কুলে বাচ্চাকে ভর্তি করানোর পরও সেই বাচ্চাকে সেই স্কুলের স্যারদের কাছে কিংবা অন্য কোন স্যার বা কোচিংএ প্রাইভেট পড়াতেই হবে তাহলে নামি দামি স্কুলে ভর্তি করে লাভ কি? হ্যা এটা আমি অবশ্যই বিশ্বাস করি যে ভাল স্কুলের পরিবেশ ভাল হয় এবং পড়াশোনার মান তুলনামুলক ভাবে অনেক ভাল হয়।তার মানে এই নয় যে অপেক্ষাকৃত সাধারণ মানের স্কুলের ছেলে মেয়েরা কিছুই শেখেনা এবং জীবনে কিছুই হতে পারেনা।

যে টাকা আপনার বাচ্চাকে নামিদামি স্কুলে ভর্তির জন্য খরচ করেছেন কিংবা ডোনেশান দিয়েছেন কিংবা কোচিং প্রাইভেট করে খরচ করেছেন সেই টাকা আপনার হাতে রাখুন। বাচ্চাকে বাসার পাশের সাধারণ কোন স্কুলে ভর্তি করান। তার পর সেই হাতে রাখা টাকা গুলো বাচ্চার পড়াশোনার এবং সার্বিক কল্যানের জন্য খরচ করুন। দেখবেন আপনার বাচ্চা অনেক নামি দামি স্কুলের সেরা ছাত্র ছাত্রীর চেয়ে কোন অংশেই খারাপ রেজাল্ট করবে না। বরং তার উপর প্রেশার কম থাকায় সে বরং পড়াশোনার পাশাপাশি কোকারিকুলার একটিভিটিস গুলোতেও ভাল করবে।তাদের শৈশব কৈশর হারিয়ে যাবেনা। উত্তরা থেকে মতিঝিল কিংবা মতিঝিল থেকে মিরপুর যাওয়া আসা করে যে সময় নষ্ট হয় সেই সময়টাও সে কাজে লাগাতে পারবে।

মূল কথা হচ্ছে ভাল স্কুলে ভর্তির জন্য যদি এতোই দৌড়ঝাপ করবো তাহলে কেন বাচ্চাকে ধর্ম কিংবা শারিরীক শিক্ষার মত সাধারণ বিষয়েও স্কুলেরই টিচারের বাসায় প্রাইভেট পড়তে যেতে হবে? ভাল স্কুল, নামি দামি স্কুল তাহলে আপনার বাচ্চাকে কি দিচ্ছে? সেই স্কুলে ভর্তি করানোর জন্য কেন তবে উঠে পড়ে লেগেছেন? আপনি জানেন যে আপনি নিজে আপনার সন্তানের মেধাকে, আপনার সন্তানের সুন্দর শৈশব কৈশরকে ধ্বংস করছেন! কোচিং প্রাইভেটে যদি যেতেই হয় তাহলে নামি দামি স্কুল আর ঘরের পাশের সাধারণ স্কুলের মধ্যে পার্থক্য কোথায়? বুয়েট, মেডিকেল, ঢাকা ভার্সিটি বা অন্য যে কোন ভার্সিটিতে যে কোন বিভাগে গিয়ে আমরা যদি একটিবার খোঁজ নিয়ে দেখতাম যে কে কোন স্কুল থেকে পড়ে এসেছে তাহলেই বিষয়টা পরিস্কার হয়ে যেত।

অবাক হয়ে দেখি আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধুদের অধিকাংশই গ্রাম থেকে, মফস্বল শহর থেকে এসেছে। অখ্যাত কোন গ্রামের সাধারণ স্কুল কলেজ থেকে পাশ করে আসা ছাত্র ছাত্রীরা যে হারে বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট, মেডিকেলে চান্স পাচ্ছে এই শহরের নামি দামি স্কুল কলেজ থেকে পাশ করা ছাত্ররা আনুপাতিক ভাবে সেই হারে চান্স পাচ্ছেনা। সাধারণ স্কুলের ছাত্রটির জন্য যা ব্যয় হয়েছে তার দশগুন ব্যয় হচ্ছে শহরের ছাত্র ছাত্রীর জন্য বিশেষ করে ভাল মানের স্কুল কলেজের ছাত্র ছাত্রীদের জন্য।

এই যে ব্যয় হচ্ছে এটা তৈরি করেছি আমরা নিজেরা অভিভাবকেরা। আমার মনে করছি ভাল স্কুল কলেজে ভর্তি না করলে আমাদের সন্তানেরা ভাল মানুষ হতে পারবে না প্রতিষ্ঠিত হতে পারবেনা। এটা সম্পুর্ন ভুল ধারনা। বেরিয়ে আসুন আপনাদের দিবাস্বপ্ন থেকে। বাস্তবতা বুঝতে চেষ্টা করুন। এখন চলছে  শিক্ষাবাণিজ্য। যে যাই বলুকনা কেন নিজ থেকে একটু চিন্তা করে দেখুন তাহলেই সব পরিস্কার হয়ে যাবে। এই সব শিক্ষাবানিজ্যের বিরুদ্ধে এখনি সোচ্চার হোন। নতুবা আপনার আমার সন্তান ভাই বোন কাগজে কলমে ভাল রেজাল্টধারী হবে কিন্তু বাস্তব জীবনে কি হবে সেটা সময়ই বলে দেবে।

প্রাইভেট এবং কোচিং যেখানে করতেই হচ্ছে সেখানে নামি দামি স্কুলে পড়ানো আর না পড়ানো সমান কথা।আমি আবারও বলতে চাই নামি দামি স্কুলের পরিবেশ অনেক ভাল এবং পড়াশোনার মানও অনেক অনেক ভাল কিন্তু ওই সব প্রতিষ্ঠান একই সাথে আপনার সন্তানের উপর নানা প্রেশার তৈরি করছে এবং আপনার পকেট খালি হচ্ছে।প্রতিনিয়ত চলছে ক্লাস টেষ্ট এটা সেটা আরো কত নামে বেনামে টেষ্ট।সে গুলো ফুলফিল করতে গিয়ে আপনার আমার সন্তানেরা হাপিয়ে উঠছে।পাশ থেকে আমরা বাতাস করছি আর বলছি এইতো আর একটু চেষ্টা করো দেখবে তুমি সেরা হয়ে যাবে।আমিও মেনে নিচ্ছি ক্লাসটেষ্ট এটা সেটা টেষ্ট নিলে মেধা শানিত হয়।

কিন্তু ওর মনের মধ্যে কি লড়াই একা একা করে চলেছে তার খবর আমরা কেউ রাখিনা।কদিন আগে আমার যে বোনটি ভর্তি পরীক্ষায় চান্স পায়নি বলে আত্মহত্যা করেছে তার জন্য আমি আপনি সবাইকি দায়ী নই?ভর্তি পরীক্ষায় চান্স না পাওয়া মানেই জীবনের শেষ নয় এটা তাকে আমরা শেখাইনি বরং তাকে শিখিয়েছি ভর্তি পরীক্ষায় চান্স না পাওয়া মানেই তোমার জীবন ব্যর্থ।ফলে আমাদের বোন, আমাদের সন্তান বোঝা বয়ে বয়ে ক্লান্ত হয়ে জীবনকেই ছুটি দিয়ে দিচ্ছে।

প্রতিযোগিতার এই বিশ্বে কাউকে না কাউকে হারতেই হবে কিন্তু একবার হার মানেই জীবন শেষ নয় এই শিক্ষাটা আমরা কেউ আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মকে দিচ্ছিনা। ফলে স্বপ্নগুলো মরে যাচ্ছে সেই সাথে হারিয়ে যাচ্ছে আমাদেরই উজ্জল সম্ভাবনাময় কোন কিশোর কিশোরী তরুন তরুনী। তাই মিছেই ভ্রমের পিছনে ছুটবেন না। বাচ্চার ভবিষ্যতের কথা যদি চিন্তা করতেই হয় তবে ভেবে দেখুন আপনি ভুল পথেই এগোচ্ছেন।

১০ নভেম্বর ২০১৬,দৈনিক ইত্তেফাক।

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Most Popular

Recent Comments