Saturday, July 24, 2021
Homeপ্রবন্ধচাকরি ক্ষেত্রে বিষয় বৈষম্য কেন?

চাকরি ক্ষেত্রে বিষয় বৈষম্য কেন?

 

বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে এখন অনেক বিষয়ে পড়ানো হচ্ছে যা আমাদের মত উন্নয়নশীল দেশের জন্য মোটেই যুগোপযোগী নয়।যে দেশে চাকরির বিজ্ঞাপন মানেই বিবিএ এমবিএ চাওয়া সে দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের অপারপার বিষয়গুলোর মূল্য কি?শেখার জন্য আমরা বা আমাদের সমাজের কয়জন স্কুল,কলেজ,বিশ্ববিদ্যালয়ে যাই?সবাই যাই সার্টিফিকেট অর্জন করে ভাল চাকরি করার স্বপ্ন নিয়ে।আর চাকরি মানেই যেখানে বিবিএ এমবিএ এবং নামে মাত্র হাতে গোনা কয়েকটি বিষয়কে প্রাধান্য দেওয়া হয় সেখানে আরবী,ফার্সি,উর্দু,বাংলা কিংবা ওরকম আরো বিষয় গুলিতে পড়ে কতটা কাজে আসবে তা আমাদের জানা নেই। বরং বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ওই সব বিষয়ে ভাল রেজাল্ট করার পরও আমাদের ভাই বোনেরা হতাশ হচ্ছে চাকরির বিজ্ঞাপন গুলো দেখে।

          আমরা কোন বিষয়কেই ছোট চোখে দেখিনা বা কাউকে কারো চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেইনা বলে যারা বড় বড় কথা বলে তারাই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের উচু স্তরে বসে বিজ্ঞাপন সাজায় বিশেষ কিছু বিষয় ছাড়া যেখানে অন্যরা আবেদনই করতে পারেনা।তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে ওই সব বিষয় পড়িয়ে লাভ কি?বন্ধ করে দেওয়াইকি যুক্তিযুক্ত নয়? চাকরি পাওয়ার প্রাথমিক শর্তই যদি হয় বিবিএ এমবিএ তাহলে গোড়া থেকেই কেন আমরা সেসব বিষয় নিয়ে পড়ছিনা,পড়াচ্ছিনা।যে সব বিষয়ের আপাত দৃষ্টিতে কর্মজীবনে না কোন চাহিদা আছে না কোন মূল্য আছে, সেসব বিষয়ে ভর্তি হয়ে ছাত্র ছাত্রীদের হাতাশাই শুধু বাড়বে।আমরা মনে করিনা যে শুধু মাত্র বিশেষ কিছু বিষয়ের ছাত্র ছাত্রীরাই ওই সব চাকরি পাওয়ার যোগ্য আর বাকিরা লবডঙ্কা।চাকরির বাজারে কে কার থেকে এগিয়ে সেটা বুঝতে হলে নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রাথমিক ভাবে সব বিষয়ধারীকে আবেদনের সুযোগ দিয়ে দেখুন।কে কার থেকে ভাল তা তখনই বুঝা যাবে।যোগ্যতার বিচার আপনারা যখন সার্টিফিকেট দিয়ে করেন তখন বাকি বিষয়ধারিদের আর কিইবা করার থাকে।

          যারা ২০০৪ সালে এইচএসসি পাশ করেছিল তারা এখন অন্যদের তুলনায় আরো ভীষণ রকম বিপদে আছে।সরকার নির্ধারণ করেছিল গ্রেড পয়েন্ট ৫ এর মধ্যে ৩ পেলেই প্রথম শ্রেনী ধরা হবে।সেই দিক বিবেচনা করেই সব চলছিল। ইদানিং দেখা যাচ্ছে বিজ্ঞাপনগুলোতে গ্রেড পয়েন্ট ৫ এর মধ্যে ৪ থেকে ৪.৫ চাওয়া হচ্ছে।২০০৪ সালে বা তার আগে পাশ করা ছাত্রছাত্রীদের কতজন ওরকম গ্রেড পয়েন্ট নিয়ে পাশ করেছিল?তাদের বয়স শেষের পথে এবং তাদের মধ্যে অনেকেই বেকার।যাওবা স্বপ্ন ছিল, এখন গ্রেড পয়েন্টের খড়গের নিচেয় তারা মরিমরি করছে।

          ঢলাও করে এ প্লাসের বন্যা বইয়ে দিয়ে এখন পু্বর্সুরীদের বিপদে ফেলে দিয়েছে এদেশেরই কতিপয় নীতিনির্ধারকেরা।কে তাদের বুঝাবে, যারা নিজেরাই বুঝতে পারেনা।একটা গ্রাম্য প্রবাদ আছে উঠলো বাই চললো বু দরগায় যাই। এদেশেও হয়েছে তাই। যখন যার যা খুশি তাই নিয়ম করে নিচ্ছে।

          চাকরির বিজ্ঞাপন গুলোতে হাতে গোনা কয়েকটা বিষয় ছাড়া বাকি বিষয়ের ছাত্র ছাত্রীরা আবেদন করার সুযোগটুকুও পাচ্ছেনা। এটা সম্ভবত বেকারত্বকে মাথায় পেতে নেওয়া অগণিত ছাত্রছাত্রীরা ছাড়া এ দেশের কারো চোখে পড়েনা, কারো মাথায় ঢোকেনা। হাতে গোনা বিষয় গুলি ছাড়া বাকিরা যদি আবেদন করার সুযোগই না পাবে তবে বন্ধ করে দিন ওই সব বিষয় যার কোন বাজার মুল্য নেই। মুহাম্মদ জাফর ইকবাল স্যার একবার বলেছিলেন এ দেশে প্রত্যেক ছাত্র ছাত্রীকে দুটো বিষয়ে পড়তে সুযোগ দেওয়া উচিত। একটা হলো বিবিএ এমবিএ যা দিয়ে সে চাকরি করে খাবে, আরেকটা হলো সে অন্তর থেকে যে বিষয়ে পড়তে ইচ্ছা করে সেটা।

          বিসিএস এবং সরকারী কিছু কিছু চাকরি ছাড়া কর্ম জীবনে প্রবেশের ক্ষেত্রে বিভিন্ন মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানী গুলো পছন্দের তালিকায় শীর্ষে।সেগুলো বাদেও পন্য বাজারজাত করে এমন সব কোম্পানীতে মার্কেটিং এর চাকরির ক্ষেত্রেও বাকি সব বিষয়কে মুল্যায়নও করা হয়না।গুড়ো দুধ বিক্রি করুন আর সয়াবিন তেল বিক্রি করুন সব ক্ষেত্রেই হাতে গোনা কয়েকটি বিষয় ছাড়া বাকিরা যেন যোগ্যই নয়।তাহলে বিশ্ববিদ্যালয় গুলো কেন জেনে শুনে ওসব বিষয়ে ভর্তি করিয়ে পড়ানো হচ্ছে? এটাকি বিশ্ববিদ্যালয় বা শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা জানেনা?জানার পরও কেন ওসব বিষয় চালু রয়েছে?

          হয় চাকরি ক্ষেত্রে এই সব বিষয় বৈষম্য দূর করুন নয়তো চাকরির বাজারে হাতে গোনা যে বিষয়গুলো সবাই মূল্যায়ন করছে সেগুলোর বাইরের সব বিষয় বন্ধ করে দিন। কথায় বলে দুষ্টু গরুর চেয়ে শুন্য গোয়াল ভাল।যে বিষয়ে পড়ে কর্ম জীবনে প্রবেশের ক্ষেত্রে প্রতিনিয়ত হয়রানির শিকার হতে হয় সেই সব বিষয়ে পড়ার চেয়ে না পড়াই কি ভাল নয়?

          ঢলাও ভাবে এ প্লাসের বন্যা শুরু হওয়ার আগে যারা এইসএসসি পাশ করেছিল তাদের কথা বিবেচনা করে সর্বক্ষেত্রে গ্রেড পয়েন্ট ৩ প্রাপ্তদের আবেদন করার সুযোগ দিতে হবে।যে কোন চাকরির ক্ষেত্রে (ইঞ্জিনিয়ারিং এবং ক্ষেত্র বিশেষ বাদে) প্রাথমিক আবেদনের ক্ষেত্রে কোন বিষয়ের বেড়াজাল রাখা চলবেনা।ডিজিটাল বাংলাদেশে ওগুলো এক একটা এনালগ সিস্টেম ছাড়া আর কিছু নয়।প্রাথমিক আবেদনের সুযোগ সবারই থাকা উচিত। তার পর ধাপে ধাপে কেউ মেধার বলে টিকে গেলে সে যোগ্য বলে বিবেচিত হবে। চাই সে আরবীতেই পড়ুক আর সংস্কৃতিতেই পড়ুক।আর না টিকলে সে বিবিএ এমবিএ হলেও বাতিল বলে বিবেচিত হোক এটাই সবার কাম্য।

          মূলত আমাদের দেশে কর্মমূখী শিক্ষার বড়ই অভাব।কারীগরি শিক্ষাই বলি আর অন্যান্য বিষয় বলি কোনটাই মূলত এদেশের অধিকাংশ কাজের সাথে খাপ খায়না।মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত ধরে বাংলাদেশ তার কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌছার পর এ দেশ যেদিন উন্নত দেশে পরিণত হবে সেদিন আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইচ্ছা মত যে কোন বিষয় নিয়ে পড়লেও কোন সমস্যা থাকবেনা।কারণ তখন কর্মসংস্থানের কোন অভাব থাকবেনা।তবে বর্তমান পরিস্থিতির কথা চিন্তা করলে নীতিনির্ধারকদের আরো কড়া হতে হবে।চাকরিদাতারা কেন অন্য সব বিষয়কে আবেদনের সুযোগ থেকেও বঞ্চিত করছে তার জবাব চাইতে হবে। সেই সাথে সরকার নির্ধারিত গ্রেড পয়েন্ট তিনের বদলে কেন চার বা সাড়ে চার চাওয়া হচ্ছে তাও খতিয়ে দেখতে হবে।পাঁচটা বিষয়কে প্রধান্য দিয়ে বাকি ত্রিশটা বিষয়কে পায়ে মাড়িয়ে গেলে দেশে একদিন বেকারত্ব এতো বেড়ে যাবে যে জনসংখ্যার দুই তৃতীয়াংশ তখন বেকার হয়ে বসে থাকবে।এদেশের আকাশ সেদিন বেকারের দীর্ঘশ্বাসে ভারি হয়ে উঠবে।সে ভার সইবার মত শক্তি তো আমাদের নেই।

১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৭,দৈনিক ইত্তেফাক।

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Most Popular

Recent Comments