কেউ কথা রাখেনি

বাঙালীর মূখে বুলি ফুটেছে।এখন সে অনর্গল কথা বলে যাচ্ছে।তবে সেই সব কথা প্রগল্ভতায় ভরা।বাঙ্গালীর নতুন নাম দেওয়া যেতে পারে কথা বলার বাঙ্গালী। তবে কথারও লিমিট থাকা উচিত।রাজনৈতিক নেতাদের সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে আমাদের কথা বলার প্রতিযোগিতা। কে কত কথা বলতে পারে সেটাই যেন মুখ্য বিষয়। স্বাধীনতার পর এ দেশটা ক্ষুধা দারিদ্র্যের চরম পর্যায়ে ছিল।ধীরে ধীরে একটু একটু করে দেশটা অনেকটাই এগিয়েছে। আরো অনেক বেশি এগিয়ে যেতে পারতো যদি আমাদের লাগামহীন কথা বলা বন্ধ করা যেত। চারদিকে আজ কথা কিংবা অকথার ফুলঝুরি। রাস্তার মোড়ে মোড়ে সত্তুর পার্সেন্ট ডিসকাউন্টে এনার্জি লাইটের বিজ্ঞাপনের শব্দ শোনেনি ঢাকাতে এমন একটা মানুষও পাওয়া যাবে বলে মনে পড়েনা। লাগামহীন ভাবে বলে চলছে দোকানে কিনতে গেলে বেশি লাগবে আমাদের থেকে নিয়ে অতো পার্সেন্ট ডিসকাউন্ট। দোকানে যদি বেশি দামেই বিক্রি করা যায় তবে কোম্পানী কেন কম দামে বিক্রির জন্য রাস্তার মোড়ে মোড়ে শব্দদুষণ করছে। এগুলো আমাদের গা সওয়া হয়ে গেছে।

ক্লাসে শিক্ষকদের কথা বলা কমেছে।তারা বরং ছাত্রদের বলে অমুক চ্যাপ্টার বাসা থেকে পড়ে এসো।অথচ তাদের ক্লাসে কথা বলার কথা ছিল। তাই বলে মাঠে ময়দানে কথা বলা কিন্ত কমেনি। রাজনৈতিক নেতারা গলা ফাটিয়ে কথার ফুলঝুরি আর মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে,টিভিতে টকশোতে কতিপয় জ্ঞানীজন জ্ঞান বিলিয়ে যাচ্ছে। যিনি ওপার বাংলার সিরিয়ালের বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় বক্তব্য দিয়ে বাহবা পাচ্ছেন তার ঘরেই হরহামেশা চলছে জিবাংলা, স্টার জলসা কিংবা ডোরেমন নবিতাদের নিয়ে মাতামাতি। আজ থেকে অনেক বছর আগে সুনীল গঙ্গোপাধ্যয় একটা কবিতা লিখেছিলেন ‘কেউ কথা রাখেনি’। তিনি তার কবিতায় তেত্রিশ বছর অপেক্ষার কথা বলেছেন। আমরা অপেক্ষায় আছি তার থেকেও বেশি। আসলে কেউ কথা রাখেনি,কেউ কথা রাখেনা।

হাটি  হাটি পা পা করে উন্নয়নের পথে একটু একটু করে এগিয়ে যাওয়া আজকের বাংলাদেশেও অনেক দৃশ্য আমাদেরকে খুব কষ্ট দেয়, তার একটি হল রাস্তায় ঘুমন্ত মানুষ। এখানে সেখানে ওভার ব্রিজে প্রায়ই দেখা যায় অর্ধেক শরীর রেলিঙের বাইরে রেখে ঘুমিয়ে আছে। একটা বাতাস এলেই ধুপ করে নিচে পড়বে। শহরের রাস্তার যেখানটায় আমরা থুতু ফেলি রাত হলে সেখানটাতেই কোন কোমল শরীর আলতো করে শুয়ে থাকে; এর চেয়ে স্পর্শকাতর ব্যাপার আমাদের জন্য আর কী হতে পারে?

কেন এত মানুষ রাস্তায় ঘুমায়?এই প্রশ্নটির উত্তর আমি আপনি সবাই কম বেশি জানি। প্রতিনিয়ত কর্মব্যস্ত এই শহরে গ্রাম থেকে ছুটে আসছে হাজার হাজার মানুষ। ভাগ্য বদলের আশায় ঢাকায় আসা মানুষের অধিকাংশই দিশেহারা হয়ে পড়ছে এ শহরের নির্মমতা দেখে। রাস্তায় রাত কাটানো মানুষ গুলির প্রতি আমাদের যে আবেগ তার প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বলা যেতে পারে যে, তাদের অধিকাংশ স্বভাবের কারণে তারা রাস্তায় থাকে। চোখ কান খোলা রেখে যারা রাস্তায় চলাচল করে তারা দেখেছেন যে কত মানুষ কতরকম ব্যবসা করেইনা দিনযাপন করছে। অনেকেই এক গ্লাস পানিতে একটু লেবু চিবিয়ে চিনি নাড়িয়ে  পাঁচ টাকা দিয়ে বিক্রি করছে। প্রতিদিন দুশো গ্লাস বিক্রি হলেও তার আয় হচ্ছে এক হাজার টাকা। কিংবা খুব সামান্য টাকা দিয়ে কেউ কেউ একটা ওজন মাপার মেশিন কিনে পার্কের সামনে কিংবা অন্য কোথাও বসে যাচ্ছে। স্টেশনে শুয়ে না থেকে একটা ফ্লাক্স কিনে অনেকেই রাস্তায় চা বিক্রি করছে।

এক হাজার টাকা দিয়ে যে কোন একটা বস্তিতে বাসা ভাড়া নিয়ে থাকা যায়। অর্থাৎ কেউ ইচ্ছে করলেই তার দু দিনের পারিশ্রমিক দিয়ে ফুটপাতে না থেকে একটা বাসা ভাড়া নিয়ে সুন্দর করে থাকতে পারে। তবু এই কাজটি করবে না ওই সব রাস্তায় শুয়ে থাকা মানুষ গুলো। কেননা তারা অলস কিংবা তাদের অধিকাংশই দিনে রাতে নানা অকাজে লিপ্ত থাকে। একদল মানুষ নির্মাণাধীন ভবনে ইট ভাঙ্গবে, রোদে পুড়ে উদাম গায়ে ঠেলাগাড়ি ঠেলবে এবং আরেক দল মানুষ এই কাজটি না করে রাস্তার মাঝখানের আইলেনে শুয়ে থাকবে। আমরা কোন কোন সাংবাদিকেরা সেই ঘুমন্ত মানুষ গুলোর করুণ ছবি তুলে করুণার ক্যাপশন দিবো!

নামাজ পড়ার পর দেখবেন বাইরে অনেকে ভিক্ষা করছে। তাদের দিকে তাকিয়ে দেখবেন অধিকাংশই কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করার ক্ষমতা থাকার পরও ভিক্ষা করছে। শরীর না খাটিয়ে যদি দুই চার পয়সা কামাই করা যায় তাহলে কাজ করে লাভ কি এই চিন্তাই তাদের মাথায় কাজ করে। মুখটাকে এমন করুন করে আর এমন সারল্য ফুটিয়ে তোলে যে আপনার আমার মনে আপনা আপনি দয়া উথলে ওঠে। ব্রিজে অর্ধেক শরীর রেলিঙের বাইরে রেখে যে যুবক ঘুমিয়ে আছে সে ইচ্ছে করলেই একটা টিনের বাসায় ফ্যান ছেড়ে ঘুমাতে পারতো। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করে যে ছেলেটি চাকরী না পেয়ে হীনমন্যতায় ভুগছে; ইচ্ছে করলেই সে পানিতে লেবু চিবিয়ে রাস্তায় দাড়িয়ে যেতে পারে না। আমাদের এই নিষ্ঠুর সমাজ ব্যবস্থাই তার জন্য এ কাজটাকে কঠিন করে দিয়েছে। কি পরিমান মানসিক কষ্টে তারা আছে সেটা আমি আপনি জানার পরও অনুভব করতে চেষ্টা করিনা। তাদের পরিপাটি শার্ট প্যান্ট আপনাকে আমাকে তাদের অর্থ কষ্টের কথা বুঝতে দেবে না। অথচ আমরাই ক্ষমতায় যাবার জন্য প্রতিশ্রুতির বন্যা বইয়ে দিতে দ্বিধা করিনা। ঘরে ঘরে চাকরি দেবার নামে যে মিথ্যে প্রতিশ্রুতি আমরা দিয়েছি তার কিছুই হয়নি। আগামীতেও আমাদের কথা বলা বন্ধ হবেনা।

বেকারত্ব শীতের দিনে কম্বল কালেকশনের কোন ইভেন্ট না যে একদিন পর সেটা নিয়ে আর ভাবা লাগবেনা। লক্ষ লক্ষ বেকার যুবকের বছরের পর বছর খালি পকেটের দায়িত্বটা যাদের তারা কেউ কথা রাখেনি। কথা রাখেনি সরকার,বিরোধীদল,হিউম্যান রাইটস, শিল্পতি, এনজিও… কেউ কথা রাখেনি। কিন্তু তারা কথা বলছে অবিরাম।যাদের কাছ থেকে আমরা কিছু আশা করি… যাদের জন্য বেঁচে থাকতে ইচ্ছে জাগে,সেই সব বুদ্ধিজীবীরাও কথা রাখে নি। বড় বড় গায়ক, ক্রিকেটার, লেখক,অভিনয় শিল্পী কেউ কথা রাখেনি। অথচ তাদের মুখে টিভিতে হরহামেশাই দিনবদলের কথা শুনতে পাই।কেউ কেউ বলে ‘ এবার নতুন কিছু কর’ কিন্তু তারা নিজেরাই নতুন কিছু করেনা। কেউ কেউ বলে , ‘ জেগে ওঠো আপন শক্তিতে ‘ কিন্তু তারাই জেগে ওঠা মানুষদের ঘুম পাড়িয়ে দেয়। কেউ কেউ শ্লোগান দেয় “যতদিন আমাদের হাতে থাকবে দেশ,পথ হারাবেনা বাংলাদেশ” কিন্তু বেকারত্বের বোঝা মাথায় নিয়ে ক্রমাগত নষ্ট পথে পা বাড়াতে বাধ্য হওয়া যুবকটির হাতে দেশ থাকার সুযোগ কোথায়,দেশটাইবা তাহলে পথহারাবেনা কেন? তাহলে  এই সব স্লোগান দিয়ে কী হবে ? সব ভাওতাবাজি। মধ্যবিত্তরা তাদের কষ্ট বুকের ভেতরে রেখে শার্টের বোতাম লাগিয়ে রাখে।

ফিদেল ক্যাস্ট্রোকে বলা হয়েছিল আপনি যদি জনগনকে তামাকের ক্ষতিকর দিকটার কথা বলতেন তবে জনগন সেটা শুনতো এবং ক্ষতির হাত থেকে বাঁচতে পারতো। ক্যাস্ট্রো দেখলেন তিনি নিজেই যেখানে চুরুট খান সেখানে কোন মূখে জনগনকে তামাক বর্জনের উপদেশ দিবেন। তিনি আস্তে আস্তে নিজেই চুরুট ছেড়ে দিয়ে একদিন দেশবাসীকে তামাক ছাড়ার আহ্বান করলেন। কিন্তু আমরা শহর পরিস্কার রাখো বলে লম্বা বক্তৃতা দিয়ে নিজের খাওয়া কলার খোসাটা রাস্তার মাঝখানে ফেলে দেই।গ্যাসের  অপচয় বন্ধ করতে বলি আর  ম্যাচের কাঠি বাঁচানোর জন্য ঘরের চুলাটা জ্বালিয়ে রাখি।আমরা কথা বলি কিন্তু কথা রাখিনা।

………………………………………..

২৮ এপ্রিল ২০১৬,দৈনিক ইত্তেফাক।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.