একটি কুড়িয়ে পাওয়া নাকফুল

মিরা কোথা থেকে যেন ছুটে আসলো।ওর হাত মুঠি করা,দেখেই বুঝা যাচ্ছে ভিতরে নিশ্চই কিছু একটা লুকিয়ে এনেছে।মিরার মা রান্না ঘরের ডুয়া গোবর মাটি দিয়ে লেপছিল।ওদের আরো একটা ঘর আছে সেটাতে ওরা থাকে।তবে দুটো নামেই শুধু আলাদা বাকি সব একই। মিরা মায়ের সামনে এসে দাড়ালো।মা তখন কাজে ব্যস্ত।ওর দিকে তাকানোর সময় কোথায় তার।লেপাপোছার পর গোসল সেরে রান্না বসাতে হবে।না হলে দুপুরে সবাইকে না খেয়ে থাকতে হবে।মিরা তার মুঠি করা ছোট্ট হাতটি মায়ের সামনে ধরে বললো কওতো মা হ্যানে কি আছে।

মিরার কথায় মা কান দিলনা।মিরার যেন কিছুটা মন খারাপ হলো।তবে সে আরো বেশি উৎসাহ নিয়ে মায়ের চোখের সামনে মুঠিকরা হাত ধরে বললো কওনা মা হ্যানে কি আছে।বিরক্ত হলেও মেয়ের কথায় এবার কাজ থেকে বিরতি দিয়ে বললো তুইতো মুঠ করে রাখছিস তালি কিরাম কবো যে তোর মুঠির মধ্যি কি আছে।তুই নিজেই ক কি আছে ওর মধ্যে।

মিরা মুঠি খুলে দেখালো।সেখানে ধুলো মাখা একটা নাকফুল ।সেটার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে মিরার মা মিরার দিকে তাকালো।তার চোখে মুখে স্পস্ট রাগ।তবে মিরার মা না জেনে না শুনে কখনো কোন কারণে মিরাকে মারে না।তিনি রাগত স্বরে মিরাকে প্রশ্ন করলেন তুই এই নাক ফুল কনে পালি?কার নাক ফুল খেলতি খেলতি নিয়ে আইছিস?মিরার মা জানে তার ছোট্ট মেয়েটা চুরি করতে পারেনা।খেয়ে হোক না খেয়ে হোক তারা বেঁচে আছে তবে মেয়েকে সব সময় সৎভাবে বেড়ে ওঠা শেখানোর ক্ষেত্রে তাদের চেষ্টার কোন ত্রুটি নেই।মিরার মা তার পরও প্রশ্ন করেছে এ জন্য যে ছোট্ট মিরা হয়তো খেলতে খেলতে ভুল করে কারো নাকফুল নিয়ে চলে এসেছে।

মিরা বললো মা নাকফুলডা কিন্তুক আমি চুরি করিনাই।এইডা আমি কুড়ায় পাইছি।কামালগের বাড়ির হনে যে ভেন্না গাছটা আছে হনে ভেন্না কুড়াতে গিছিলাম।কুড়াতে কুড়াতে দেহি এটটা নাকফুল ধুলোর মধ্যি চকচক করতিছে।আমি ছাড়াতো হনে আর কেউ ছিলনা তাই নিয়ে আইছি।মিরার কথা শুনে মিরার মা ওর হাত থেকে নাকফুলটা নিজের হাতে নিল।হাতের গোবর মাটি লেগে আছে।একটু নেড়ে চেড়ে দেখে মিরার হাতে দিয়ে বললো যা ঘরে থুয়ে দে পরে দেখপানে।তুই কলপাড়ে যা,বালতিতে পানি রাখছি চান করে নে।

মিরা মায়ের কথা মত নাকফুলটা ঘরে রেখে দিয়ে গোসল করতে টিউবওয়েলের ওখানে যায়।মা আগে থেকেই বালতিতে পানি ভরে রেখেছে।মাকে তার ভীষণ ভাললাগে।মা কত কাজ করে, তার পরও ওর প্রতি মায়ের যত্নের কোন ত্রুটি থাকেনা।ভাত রান্না হলে গরম গরম খেতে দেয়।স্কুলে যাবার সময় বই খাতা গুছিয়ে দেয়।বাবা সারাদিন ইটের ভাটায় কাজ করে সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরলে মা সবার আগে বদনা ভরে বাবাকে পানি দেয়,গামছা এগিয়ে দেয়।ঘুমানোর সময় রোজ রাজা রাণীদের গল্প বলে।মিরার চোখে তার মা পৃথিবীর সেরা মা।

মিরার মায়ের হাতের কাজ শেষ হওয়ায় তিনি গোসল করতে পুকুরে চলে গেলেন।যাওয়ার সময় কুড়িয়ে পাওয়া নাকফুলটাও নিয়ে গেলেন।নাকফুলটা মাটিতে পড়ে থাকায় ধুলো লেগেছিল।গোসলের সময় ওটা ধুয়ে আনা যাবে।কুড়িয়ে পাওয়া নাকফুলটাতে পানি দিতেই সেটা আরো উজ্জল হয়ে উঠলো।মিরাদের মত গরিব তল্লাটে আর দু ঘর নেই।স্বর্ণালংকারতো দূরের কথা সিটিগোল্ডও জোটেনা কখনো। বিনোদপুরের ঘোড় দৌড়ের মেলায় গিয়ে মিরা এক ডজন কাচের চুড়ি কিনতে গেলেও মনে হতো কি দরকার চুড়ি কেনার।সেই টাকা দিয়ে বাবা মা সহ এক বেলা দুটো ডাল ভাত খাওয়া যাবে।তবে নিজেরা স্বর্ণালংকার না পরলেও আশে পাশের বড়লোকদের স্ত্রী কন্যাদের পরতে দেখেও তারা আনন্দ পায়।

মিরার মা গোসল সেরে বাড়ি ফেরার পথে বার কয়েক কুড়িয়ে পাওয়া নাকফুলটা হাতে নেড়ে চেড়ে দেখেছে। সুযের্র আলো পড়তে সেটা আরো জ্বলজ্বল করে ওঠে।এটা খাটি সোনা ছাড়া আর কিছু হতেই পারেনা।কিন্তু তার পরও মিরার মা বুঝতে পারেনা সত্যিই সোনার নাকি সিটিগোল্ড।লেখা পড়া না জানা গরীব দিনমজুরের স্ত্রী হওয়ায় সিটিগোল্ড কথাটাও তার মূখে আসেনা।সে খাটিসোনাকে সোনা আর খাটিসোনা না হলে সেটাকে বলে কেমিকল।গ্রাম্য ভাষায় মানুষ কত কিছুইতো বলে।মাটিদিয়ে বানানো ঘরের চারপাশটাকে বলে ডুয়া,টিউবওয়েলকে বলে কল, আরো কত নতুন কথা যে তারা বলে তার হিসেব নেই।মেম্বারের পুকুর থেকে গোসল শেষে ফেরার পথে মিরার মা জমির শেখের বাড়ির উপর দিয়ে আসে।জমির শেখ এলাকার প্রভাবশালী ধনী ব্যক্তি।মিরার মা দেখেছে স্বাধীনতার আগে জমির শেখের অবস্থাও তাদের মতই ছিল। কিন্তু কিভাবে কিভাবে এলাকার সব থেকে ধনী হয়ে গেল তা তার মাথায় ঢোকেনি।

জমির শেখের ছেলে মেয়েরা সবাই পড়াশোনা শিখেছে।স্ত্রী কন্যাদের হাতে গলায় কানে খাটি সোনার গহনা দেখে তার মনে হয়তো সাধ জাগে তারও যদি ওরকম সোনার গহনা থাকতো।কিংবা হয়তো সাধ জাগেনা।মনে মনে হয়তো বলে গরীবের ঘরে জন্ম নিয়ে রাজরাণী হওয়ার স্বপ্ন দেখতে হবে কেন।

জমির শেখের বউ দক্ষিন ঘরের বারান্দায় বসে আয়নায় মুখ দেখছিল আর চুলে তেল দিচ্ছিল।আয়নায় মিরার মায়ের ছবি দেখে সে ফিরে তাকায়।মিরার মা তখন হাতে ধরে রাখা নাক ফুলের দিকে তাকিয়ে হাটছিল।সেটা চোখে পড়ে জমির শেখের স্ত্রীর।যদিও সে বুঝতে পারেনা যে হাটতে হাটতে মিরার মা কি দেখছে।সে চুলে তেল দেওয়া রেখে মিরার মাকে ডাকে।কিরে মিরার মা তোর হাতে কি?মিরার মা কিছু বলতে চায়নি কিন্তু যখন জমির শেখের স্ত্রী সরাসরি প্রশ্ন করেছে তোর হাতে কি তখন আর না বলে উপায় কি? আর তা ছাড়া জমির শেখের স্ত্রী সোনা রুপা ভাল চেনে।তাকে দেখি জানা যাবে এটা খাটি সোনা নাকি কেমিকল।

ভেজা শাড়ীতে মিরার মায়ের হাটতে অসুবিধা হচ্ছিল।সে ধীর পায়ে জমির শেখের স্ত্রীর সামনে গিয়ে দাড়ায়।জমির শেখের স্ত্রী আবার তাগাদা দিয়ে জানতে চায় হাতে কি?মুঠি খুলে দেখায় মিরার মা।সেখানে একটা নাকফুল।আকারে বেশ ছোট তবে রোদ লেগে সেটা জ্বলজ্বল করছে।মিরার মা বলে এটা মিরা ভেন্না কুড়ানোর সুমায় কুড়ায় পাইছে।দেহেনতো বু এইডা খাটি সুনা কিনা।গ্রামের অধিকাংশই শুদ্ধ ভাষায় কথা বলতে পারেনা।তারা সোনাকে সুনা বলে।মিরার মায়ের হাত থেকে নাকফুলটা হাতে নেয় জমির শেখের স্ত্রী।হাতে নিয়েই বুঝতে পারে বিষয়টা, তবে কপটের মত চেহারায় সেটা বুঝতে দেয়না।খানিকক্ষণ এদিক ওদিক ঘুরিয়ে দেখে বলে এইডাতো সুনা না।এইডা তো কেমিকল।কেমিকল দিয়া কি করবা?এইডা এতো যত্ন কইরা ধুইছো খালিখালি।এইডা ফেলে দেও।

মিরার মায়ের মনটা খারাপ হয়ে যায়।কেমকল হউক আর যাই হউক তা ফেলতি হবি ক্যা?মিরার মা মনে মনে নিজেকেই কথা গুলো বলে।তার পর জমির শেখের স্ত্রীর হাত থেকে নাকফুলটা নিয়ে বলে কেমিকল অইলেও ফেলুম না।মিরা কুড়ায় পাইছে ও পরতি পারবেনে।আমরাতো কিনবার পারিনা তাই ফেলে দিয়ে কি অবে।এই বলে সে হাটতে থাকে নিজের বাড়ির দিকে।গোসলে যাওয়ার আগে চুলায় ভাত তরকারী বসিয়ে দিয়ে মিরাকে বলেছে খেয়াল রাখতে।ছোট্ট মেয়েটা কতটা খেয়াল রাখতে পেরেছে তা তার জানা নেই।সে পায়ে জোর দিয়ে হাটতে থাকে।নাকফুলটার কথা আর চিন্তা করতে চায়না।

রাতে খাওয়া দাওয়া শেষ করে মিরার মা মিরাকে কাছে বসিয়ে ওর নাক থেকে সুতাটা কেটে দেয়। তার পর খুব যত্ন করে কুড়িয়ে পাওয়া নাকফুলটা পরিয়ে দেয়।মিরাকে যেন রাজকন্যা মনে হয় তার।জীবনে প্রথমবার নাকফুল পরে মিরার কী যে আনন্দ হয়।পরদিন স্কুলে গিয়ে ক্লাসের অন্য মেয়েদের দেখায়।অন্য মেয়েরা অতটা আগ্রহী হয়না কারণ তাদের আগে থেকেই অনেক সুন্দর সুন্দর খাটি সোনার নাকফুল আছে।বিকেলে মিরা খেলা শেষ করে জমির শেখের বাড়ির উপর দিয়ে আসছিল।জমির শেখের স্ত্রী ওকে ডাকলো।মিরা এদিক আয় মিঠাই খেয়ে যায়।তোর কাকা বাজার থাইকা মিঠাই আনছে ল দুইডা খা।

মিরা কিছুক্ষণ ভাবে।তার পর জমির শেখের স্ত্রীর কাছে গিয়ে দাড়ায়।তিনি ঘর থেকে ওর জন্য দুটো মিষ্টি এনে পাশে বসিয়ে খেতে দেয়।মিরা খুব মজা করে সেই মিষ্টি খায়।জমির শেখের স্ত্রী তখন মিরার নাকের দিকে তাকিয়ে বলে ওমা তুই দেহি নাক ফুল পরছিস।মিরা খুশি মনে বলে হ এইডা আমি কুড়ায় পাইছি কাকি।মা কালকে রাইতে পরায় দিছে।সুন্দর অইছে না?জমির শেখের স্ত্রী খানিকক্ষণ দেখে বললো নারে তোরে এই নাকফুলে মানায় নাই।তুই দেকতি কত সুন্দর আর তরে কিনা এই পুচকে নাকফুল পরাইছে।এইডা ঠিক মানায় নাই।মিরা বলে কি করুম কাকি আমরাতো গরিব।যা পাইছি তাই ভালা।জমির শেখের স্ত্রী বললো তুই দাড়া আমি তোর জন্যি সুন্দর একখান নাকফুল আনতিছি।

মিরাকে বারান্দায় বসিয়ে রেখে সে ঘরে গেল আর সাথে সাথে হাতে একটা নাকফুল নিয়ে ফিরে আসলো।নাকফুলটা বেশ সুন্দর। মিরার খুব পছন্দ হলো।মিরা বললো কাকি দাও আমি নিয়া যাই মা পরায় দিবেনে।জমির শেখের স্ত্রী বললেন না তোর মা পরাবি ক্যা আমিই তোরে পরায় দিচ্ছি।এই বলে তিনি মিরার ছোট্ট নাকফুলটা খুলে সেখানে ঘর থেকে আনা সুন্দর বড় নাকফুলটা পরায় দিলেন।মিরাকে আয়নায় দেখালেন।মিরার খুব পছন্দ হলো।সে বললো তালি কাকি আমি যাই এহন।মারে কবানে যে কাকি আমারে এই সুন্দর নাকফুলডা দিছে।আর আগের নাকফুলডা দেন নিয়ে যাই।জমির শেখের স্ত্রী বললেন ওই ছোট পুরোনা নাকফুল দিয়ে তুই কি করবি।তোরেতো একটা নতুন নাকফুল দিলাম।পুরোনোডা থাহুক আমার কাছে।মিরা বললো আইচ্ছা থাহুক।এর পর জমির শেখের স্ত্রী ওকে একটা পেয়ারা দিলো।সে পেয়ারা খেতে খেতে বাড়ি চলে গেল।ভুলে গেল নাকফুলের কথা।মিরার মায়েরও আর মনে হলোনা তিনি তার মেয়েকে কোন নাকফুল পরিয়েছিলেন আর এখন কোন নাকফুল আছে।

জমির শেখের স্ত্রী মিরার নাক থেকে খুলে নেওয়া ছোট্ট নাকফুলটা হাতে নিয়ে নেড়ে চেড়ে দেখতে দেখতে বিড়বিড় করে বলতে লাগলো খাটি সোনা ছাড়িয়ে যে নেয় নকল সোনা সেতো সোনা চেনেনা।তার মূখে কুটিল হাসি ফুটে উঠলো।সে ছোট্ট অবুঝ শিশুটিকে মিষ্টি,পেয়ারা আর একটা সিটিগোল্ডের দেখতে সুন্দর নাকফুলের বদলে ছিনিয়ে নিলো খাটি সোনার নাকফুল।লোভে পড়ে সে অবুঝ শিশুটিকে ধোকা দিল।মিরা কিংবা তার মা সেটা জানতেও পারলোনা।মিরাদের কোন লোভ নেই।তাদের জীবনে খাটি সোনা আর ইমিটেশান একই।

–জাজাফী

১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৭

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.