বাঙ্গালীর ধৈর্য্য

হতাশাবাদীরা উদয়মান  সূর্যকে মনে করে অস্তগামী।হাতাশার চাদরে তারা এমনভাবে জড়িয়ে আছে যে সেখান থেকে আর বেরিয়ে আসতে পারছেনা। তাদের সামনে একটা গ্লাসের অর্ধেক পানি পূর্ণ করে উপস্থাপন করলে তারা বলে অর্ধেক গ্লাস খালি। কখনো ভেবে দেখেনা ক্লাসটা অর্ধেক পূর্ন। চারদিকে আজ হতাশাবাদীদের ভীড়। কিন্তু তার পরও আশাবাদীদের সংখ্যাও কোন অংশে কম নয়। এখনো এদেশে অনেক মানুষ আছে যারা সুন্দর আগামীর স্বপ্নে বিভোর। যারা মনে মনে বিশ্বাস করে আগামীর বাংলাদেশ হবে শিক্ষা শান্তি প্রগতিতে বিস্ময়জাগানিয়া দেশ। মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড়।যে যত বড় স্বপ্নই দেখুকনা কেন সে যদি সেই স্বপ্নটা বাস্তবায়নের জন্য চেষ্টা করে তবে সে তা পারে।একজন বিলগেটস একদিনে তৈরি হয়না,একজন ড.মুহম্মদ ইউনুস রাতা রাতি জন্ম নেয়না। তার জন্য দরকার দৃঢ়প্রত্যয়, দরকার অকৃত্রিম ভালবাসা এবং ধৈর্য্য। বাঙ্গালীদের আর যাই হোক ধৈর্য্যের অভাব নেই এবং কোন কালেও অভাব ছিলনা। বাঙ্গালীদের ধৈর্য্যের বর্ণনা দেওয়ার মত যথাযথ শব্দও খুজে পাওয়া কঠিন। হয়তো বলতে পারি পাহাড় সমান ধৈর্য্য আছে বাঙ্গালীদের কিন্তু তাতেও কমই বলা চলে। আমরা যে কত বড় ধৈর্য্যশীল তার প্রমান আমাদের চোখের সামনেই ভূরিভূরি পাওয়া যাবে। দায়িত্বশীল মন্ত্রী যখন কোন একটা ঘটনার তদন্তের ব্যাপারে ৪৮ ঘন্টা সময় নেয় আমরা তখন আশাবাদী হই এবং সেই আটচল্লিশ ঘন্টা আর শেষ হয়না। যদিও ৪৮ দিন যায় ৪৮ মাস যায় কিংবা হয়তো ৪৮ বছরও যাবে। তার পরও বাঙ্গালীদের ধৈর্য্যর বাঁধ ভাঙ্গেনা। তারা ধৈর্য্য ধরে অপেক্ষা করে কবে সেই আটচল্লিশ ঘন্টা শেষ হবে। বাঙ্গালীরা বরাবরই ক্রিকেট পাগল। খেলা দেখার টিকেটের জন্য ঘন্টারপর ঘন্টা লাইনে দাড়িয়ে থাকে,ঈদ কিংবা পূজাপার্বনে পরিবারের সাথে সময় কাটানোর জন্য ট্রেনের টিকেটের লাইনে ঘন্টারপর ঘন্টা দাড়িয়ে থেকে অনেকেই টিকেট না পেয়ে খালি হাতে ফিরে যায় তার পরও ধৈর্য্যের বাঁধ ভাঙ্গেনা।আমাদের ধৈর্য্যের নিত্যদিনের উদাহরণ ঢাকা শহরের অবিরাম যানজট। সকাল সাতটায় উত্তরা থেকে মতিঝিলের উদ্দেশ্যে রওনা হলে দুপুর গড়িয়ে যায় আর আমরা ধৈর্য্য ধরে অপেক্ষা করি।রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে দ্বিধাদ্বন্দের দোলাচালে শুরু হয়েছিল এসএসসি পরীক্ষা। ধৈর্য্য যেন বাঙ্গালীদের জন্মগত বৈশিষ্ট্য। তাই আমাদের কোমলমতি শিক্ষার্থীরাও দেখিয়েছে তাদের সীমাহীন ধৈর্য্য। দিন যায় মাস যায় কিন্তু তাদের পরীক্ষা যেন শেষই হতে চায়না। শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি তাদের অভিভাবকেরাও ধৈর্য্যের পরীক্ষা দিয়েছেন। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য আমাদের পিছু ছাড়েনি। এতো ধৈর্য্যের পরীক্ষা দিয়েও আমাদের রেহাই নেই। আমাদের জন্মই যেন হয়েছে আজন্ম ধৈর্য্যের পরীক্ষা দেওয়ার জন্য। যে শিক্ষার্থীরা দীর্ঘ দিন ধরে এসএসসি পরীক্ষা দেওয়ার ধকল সহ্য করার পর আশার জাল বুনেছিল ফলাফলের পর কলেজে ভর্তি হবে, তাদের সে স্বপ্নটা ক্ষীণ হয়ে যায় যখন ভর্তিপরীক্ষার ফলাফল বার বার পেছানো হয়। তারপরও তারা ধৈর্য্য ধরেছে। এ যেন ধৈর্য্যধারনের কোন প্রতিযোগিতা। নীতিনির্ধারকদের চরম অবহেলা আর অদূরদর্শীতাই এসবের মূল কারণ। মেয়েদের কলেজে ছেলেরা চান্স পাচ্ছে তারপরও আমরা বিকার হয়ে বসে আছি। কলেজে ভর্তি হবার অধিকার যেন রিলিফের চাল পাওয়ার মত। লাইন ধরে দাড়িয়ে থাক,অপেক্ষা করো তবেই তাদের মর্জিমত তোমাকে দেওয়া হবে। অদক্ষদের হাতে যখন কোন একটা দায়িত্ব দেওয়া হয় তখন আমাদের কেবল ধৈর্য্য ধারণ করে দিনের পর দিন মাসের পর মাস এমনকি বছরের পর বছর অপেক্ষা করা ছাড়া আর কিছুই থাকেনা।শিক্ষা ব্যবস্থা দিনের পর দিন হুমকির মূখে পড়ছে।দাবী করা হচ্ছে বছরের প্রথম দিন কোটি কোটি শিশু শিক্ষার্থীদের হাতে বই তুলে দেওয়ার কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন কথা বলছে। বছরের এক তৃতীয়াংশ চলে যাওয়ার পরও কোথাও কোথাও শিক্ষার্থীদের হাতে বই পৌছাচ্ছেনা। সেই সব বইই বিক্রি হচ্ছে কোন কোন লাইব্রেরীতে।সৃজনশীলতার নামে চলছে মেধা ধ্বংসের পায়তারা। বাজারে অহরহ বিক্রি হচ্ছে সৃজনশীল গাইড। তারা হাতে ধরে শেখাচ্ছে সৃজনশীলতা। সৃজনশীলতা কি মোটর ড্রাইভিং শেখার মত যে হাতে ধরে শেখানো যাবে। যে শিক্ষার্থীরা আমাদের আগামী দিনের চালিকা শক্তি আজ আমরা তাদের শিক্ষাজীবনকে হুমকির মূখে ফেলে উপরন্ত আমাদের স্বপ্নময় আগামীকেই হুমকির মুখে ফেলে দিচ্ছি। মাসেরও অধিক সময় ব্যায় করে এসএসসি পরীক্ষা শেষ করার পর ফলাফল হলো এবং শিক্ষার্থীরা আশায় বুক বাঁধলো কলেজে ভর্তির। এবার অনলাইনে ভর্তি ব্যবস্থা চালু হওয়ায় আমরা বেশ আশায় বুক বেঁধেছিলাম কিন্তু আমাদের সব আশা তাসের ঘরের মত ভেঙ্গে যায় যখন দেখি ফলাফল বের হওয়া নিয়ে নাটকের নিত্যনতুন মহড়া। আরো হতাশ হতে হয় যখন সেই ফলাফলে মেয়েদের কলেজে ছেলেদের নাম উঠে আসে। আমাদের দেশে দক্ষ নাবিকের অভাব কোন কালেও ছিলনা কিন্তু তার পরও আমরা বার বার অদক্ষদের হাতে হাল ধরিয়ে দিয়ে মাঝ দরিয়ায় খাবি খাচ্ছি। শিক্ষা ব্যবস্থায় আমুল পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। শিক্ষার্থীরা যেন সময় মত পরীক্ষা দিয়ে পাশ করে বের হয়ে আসতে পারে সে ব্যবস্থা নীতিনির্ধারকদের নিশ্চিত করতে হবে। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার দূর্বলতা গুলো দূর করা না গেলে আগামী প্রজন্ম ক্ষতিগ্রস্থ হবে যা অন্য অর্থে আমাদের দেশের ভবিষ্যতকেই হুমকিতে ফেলে দেবে। যখন নির্ধারিত সময়ে একজন শিক্ষার্থী তার শিক্ষাজীবন শেষ করতে না পারে তখন স্বাভাবিক ভাবেই তার মধ্যে হতাশা কাজ করে,বেকারত্বের হার বাড়ে। আজকে যে শিক্ষার্থীরা সবে মাত্র কলেজে ভর্তি হবে বলে আশায় বুক বেঁধেছিল তাদের ভর্তি নিয়ে যে অনাহুত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে তা সত্যিই উদ্বেগজনক।তার পরও আমরা ধৈর্য্য ধরে আছি,হয়তো ধৈর্য্যের সীমানা প্রাচীর দিয়ে কোন একদিন উকি দেবে সুদিনের সুর্য।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.