ছোটমামার পান্তা ইলিশ খাওয়ার গল্প

ছোট মামা বাংলা নববর্ষ উপলক্ষ্যে কদিন আগেই পুরো পরিবার সহ আমেরিকা থেকে বাংলাদেশে এসেছেন।তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন আমাদের সব কাজিনদের নিয়ে রমনাতে যাবেন আর উৎসব করে পান্তা ইলিশ খাবেন।বড় পরিবার কাকে বলে তা আমাদেরকে না দেখলে কেউ ভাবতেই পারবেনা।গুনে গুনে ক্লাস সিক্স বা তার উপরে পড়ে এমন কাজিনের সংখ্যাই ৩৯ এর উপরে।আমাদের সবার বড় তাসনুভা আপু।সেই প্রথম মামাকে বললেন মামা আমি তোমাদের সাথে রমনাতে যাবনা এবং পান্তা ইলিশও খাবনা।মামা অবাক হয়ে বললেন কেন যাবেনা এবং কেন খাবেনা।টাকাতো আমিই দেব।

তাসনুভা আপু বললো তুমি দেবে সেটাতো জানি তার পরও যেতে পারবোনা। তুমি একটা কাজ করো এক প্লেট পান্তা ইলিশের যে দাম হবে সমপরিমান টাকা আমাকে দিয়ে দাও।মামা হকচকিয়ে গেলেন।তবে তিনি তার ভাগ্নে ভাগ্নিদের খুব ভালবাসেন।কোন কথা না বলে তিনি তাসনুভা আপুকে তিনশো পঞ্চাশ টাকা ধরিয়ে দিলেন।দুমিনিট যেতে না যেতেই গুটিগুটি পায়ে সেখানে এসে হাজির ফারহানা।ও আমাদের মেজ খালামনির মেয়ে।মামার সামনে দাড়িয়ে বললো আচ্ছা মামা শুনলাম তুমি এবার আমাদের সবাইকে রমনাতে নিয়ে পান্তা ইলিশ খাওয়াবা?

ওর কথা শুনে মামা খুশি হয়ে বললেন হ্যা অবশ্যই।তোরা সবাই রেডি হয়।দেখনা তাসনুভাটা কেন যেন যেতেই চাইছেনা।ফারহানা বললো মামা একটা সমস্যা ছিল।সমস্যার কথা শুনে মামা বললেন কি সমস্যা বল আমি সমাধান করে দেব।ফারহানা মুখটা যথেষ্ট মলিন করে বললো মামা আমিওনা কালকে তোমার সাথে রমনাতে পান্তা ইলিশ খেতে যেতে পারবো না।তুমি আমাকেও পান্তা ইলিশের টাকাটা দিয়ে দাও।অগত্য মামা ওকেও টাকা দিয়ে দিলেন।ভেবেছিলেন আর হয়তো কেউ ওরকম করবেনা কিন্তু দেখা গেল দুমিনিট অন্তর অন্তর এক একজন এসে বলতে লাগলো সে রমনাতে যেতে পারবেনা।

সেই তালিকায় ছিল পুর্নতা,মিফরা,মেহনাজ,শতাব্দী,অহনা,পুষ্পিতা,নওরিন,নোভারিতা,আসিফ,মাহি,সিনদিদ,তনিকা,নোশিন,মীম,অন্তরা সহ সবাই।দেখা গেল আমি আর আমার দুজন পিচ্চি পিচ্চি কাজিন ছাড়া আর কোন বাচ্চাকাচ্চাই মামার সাথে রমনাতে পান্তা ইলিশ খেতে যেতে রাজি নয়।মামা গুনে গুনে সবাইকে টাকা দিয়ে দিলেন।মামা হতাশ হয়ে বললেন সেই আমেরিকা থেকে ছুটে এলাম সবাইকে নিয়ে রমনাতে বসে পান্তা ইলিশ খাবো বলে আর এখন আমার ভাগ্নে ভাগ্নি ভাস্তিরা সব গো ধরেছে।আমি বললাম মামা সমস্যা নেই আমিতো আছি।চলো আমরাই যাব। ওরা যায় যাক না যায় থাক।মামা বললেন তা হয়না।আমি আবার বললাম পরিবারের বড়রা সবাইতো যাবে তাহলে?তবুও মামার মন খারাপ হয়ে গেল।
উপায় না দেখে বাসায় রান্নার ব্যবস্থা হলো।পান্তা ইলিশের বিরাট আয়োজন করা হলো। মামাই সব টাকা দিলেন। তবে বললেন তাসনুভাদের কাউকে কিন্তু পান্তা ইলিশ দেওয়া হবেনা কারণ সবাইকে টাকা দিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাসনুভা আপুরা কেউ অবশ্য তাতে গা করলোনা।

সন্ধ্যার দিকে দেখি দুলাল কাকা একটা থলেতে করে বড় বড় চারটা ইলিশ মাছ নিয়ে হাজির। বাবা বললেন দুলাল এই মাছ কোথা থেকে আনলে? কি ব্যাপার?আমিতো ছোটনকে নিয়ে গিয়ে আগেই মাছ কিনে এনেছি।দুলাল কাকা চেপে গেলেন।তাকে আসলে আগেই সেভাবে শিখিয়ে দেওয়া হয়েছিল।তিনি বললেন বাজার থেকেই দিয়েছে। বলেছে আপনি নাকি মাছ কিনে ভুরে রেখে এসেছেন।কিন্তু দেখা গেল রান্নাঘরে আগেই মাছ আছে।অগত্যা সেগুলোও কোটা হলো।বেশ ভালভাবে রান্নাও হলো। ছোট মামা বললেন কাল সকালে বেশ মজা করে একসাথে সবাই অনেক গুলো ইলিশের পেটি দিয়ে পান্তা খাওয়া যাবে।

সকালে আমি ঘুম থেকে উঠে প্রথমে তাসনুভা আপুকে ডাকতে গেলাম। দেখি সে ঘরে নেই।একে একে বাকিদেরকেও খুজতে গিয়ে দেখি কেউ নেই।আমি বাবাকে গিয়ে বললাম আপুরা কেউতো বাসায় নেই। আমাকে রেখে কে কোথায় গেল?আমরা সবাই মিলে না পান্তা ইলিশ খাব।বড়রাও বেশ অবাক হলেন। ওরা সব দল বেধে গেল কোথায়। আম্মু বললেন নিশ্চই মেলা দেখতে গেছে। কিন্তু আমরা যখন পান্তা ইলিশ খাব বলে রেডি হয়েছি তখন দেখি তাসনুভা আপুরা দল বেধে বাসায় ঢুকছে।

আমাদের কাজিনগুলোর বাইরেও তাদের সাথে দেখি অনেক গুলো ছেলে মেয়ে। যাদের সবার গায়ে নোংরা পোশাক,পায়ে সেন্ডেল নেই। সবার আগে তাসনুভা আপু দাড়িয়ে দাড়িয়ে যেন কৈফিয়তের সুরে বললো আমরা শখ করে বৈশাকে হাজার টাকা দিয়ে পান্তা ইলিশ খাই।আর এরা সারা জীবন পান্তা খায় কিন্তু ইলিশের স্বাদ যে কি তা পায়না কোন দিন।আমরা তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম এবার ওদেরকে আমরা খাওয়াবো।তাই দুলাল কাকাকে দিয়ে অতিরিক্ত চারটা ইলিশ মাছ কিনেছি।

তখন সবাই বুঝলো আসল ঘটনা। ওদের কথা শুনে বড়দের চোখে পানি চলে আসলো। ছোট মামা সিদ্ধান্ত নিলেন আসলেইতো পান্তা ইলিশ একটা বিশাসীতা ছাড়া কিছুই নয়। বৈশাখের প্রথম দিনে পান্তা ইলিশ না খেলে নতুন বছর শুরু হবেনা এমনতো নয়।তাই এর পর থেকে একদিন বাঙ্গালী আর হতে চাইনা। আমরা সেই সব পথশিশুদের সাথে নিয়ে সেবার পান্তা ইলিশ খেলাম। তার পর কোন বৈশাখেই আর আমরা ঘটা করে পান্তা ইলিশ খাইনা। মামাও খায়না। তবে হা পহেলা বৈশাখে আমাদের প্রিয় ছোট মামার জন্মদিন থাকায় আমরা প্রতি বছর পহেলা বৈশাখে তাকে উইশ করি। ছোট মামা (Ever Sajib) এবারও তোমাকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা ও ভালবাসা। তুমি আমেরিকা থেকে ফিরে আসো।
——
ছোটমামার পান্তা ইলিশ খাওয়ার গল্প
#জাজাফী
১ লা বৈশাখ ১৪২৪
১৪ এপ্রিল ২০১৭