তার আগমন



মেঘাচ্ছন্ন আকাশকে উপেক্ষা করে বইপ্রেমীরা কিংবা খুশিতে ঠেলায় ভাল্লাগে ঘোরতে টাইপের অগণিত বিভিন্ন বয়সী মানুষ আজ বইমেলায় এসেছিলেন।লিখিত নিয়মে শেষ দিন বলে কথা।অগণিত পাঠক দর্শক লেখক এবং বিক্রেতার ভিড়ে এক তরুণকেও দেখা যাচ্ছে।কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে সে ঘুরছে এক স্টল থেকে আরেক স্টলে।বই দেখছে এবং কোনটা পছন্দ হলে কিনে নিচ্ছে।নালন্দার সামনে সে কিছুক্ষণ দাড়ালো।অনেক বই বিক্রি হচ্ছে।কোন কোন নামিদামী লেখক,জনপ্রিয় লেখক দাড়িয়ে দাড়িয়ে পাঠকদের অটোগ্রাফ দিচ্ছেন।মুখে ধরে রেখেছেন মিষ্টি হাসি।সেই তরুণ সামনে এগিয়ে গেলেন।এক লেখকের বইয়ের কপি নিলেন।বইটি নিয়ে দারুণ আলোচনা হচ্ছে।বইটি কিনবেন বলে মনস্থির করলেন।লেখক তখন বইটি চাইলেন অটোগ্রাফ দিবেন বলে।সেই তরুণ আর কি বলবে বইটি এগিয়ে দিলেন।লেখক নাম জানতে চাইলেন কিন্তু সেই তরুণ নাম বলতে অসুবিধা আছে বলে জানালেন।তিনি বললেন আমাকে আপনিও চেনেন এবং নাম বললে চিনে ফেলবে অগণিত মানুষ। সুতরাং খুব সমস্যা হবে।জনপ্রিয় সেই লেখক ভীষণ আশ্চর্য হলেন।তার সামনে দাড়ানো তরুণ পাঠকের মুখের দিকে তাকিয়ে তিনি কোন ভাবেই চিনতে পারলেন না।পাঠকের কাছে তিনি অনুরোধ করলেন কানের কাছে মুখ নিয়ে অন্তত তিনি যেন তার নামটি বলেন।

জনপ্রিয় লেখক যখন এমনটি আবদার করেছেন তখন সেই তরুণ আর না করতে পারলেন না।স্টলের দিকে মুখ এগিয়ে নিয়ে লেখকের কানের কাছে নিজের নাম বললেন।নাম শুনে লেখক ভীষণ চমকে উঠলেন।তার চোখ যেন বিশ্বাসই করতে পারছে না। এই নাম তিনি অগণিতবার শুনেছেন।এমনকি এক জীবনে নিজের নাম যতবার শুনেছেন তার চেয়েও বেশিবার শুনেছেন এই তরুণটির নাম।আশ্চর্য কখনো তাকে দেখেননি।লেখক আবদারের সুরে বললেন ভাই আপনার সাথে একটি ছবি তুলতে চাই।তরুন বিনয়ের সাথে তা প্রত্যাখ্যান করলেন। বললেন আপনিতো জানেন আমার অবস্থা।আমি সবিনয়ে এই প্রস্তাব থেকে সরে আসতে চাইছি।যেহেতু আমার কাছে আপনার নাম্বার আছে এবং এই যে আজকে দেখা হলো আগামীতে আমি ফোন করেই না হয় আপনার সান্নিধ্যে চলে আসবো। এ কথা শুনে জনপ্রিয় লেখক বললেন কি যে বলেন!আপনার তুলনায় আমিতো সামান্য মানুষ।বিদায় নিয়ে তরুনটি নালন্দা থেকে সামনে এগিয়ে গেলেন।

প্রথমার স্টল পেরিয়ে বাংলা একাডেমী ক্যান্টিনের দিকে তরুণ হাটতে শুরুকরলো।পথে দেখতে পেলেন কবি ও নাট্যকার আসাদুল ইসলাম তার একমাত্র কন্যা মেঘদূত এবং মেঘদূতের মাকে সাথে নিয়ে সেলফী তুলছেন।তরুন সেটি ভালোভাবে লক্ষ্য করলেন।তরুণ জানেন মেঘদূত এবং তার বাবা মা দুজনই তার নাম অনেকবার শুনেছেন কিন্তু কখনো দেখেননি।যদি জানতেন এই তরুণটিই সেই আলোচিত তরুণ তবে তিনি অবাক হতেন।তরুণটি এই অভিনেতা পরিবারকে পাশ কাটিয়ে বাংলাএকাডেমী ক্যান্টিনের পথে পা বাড়ালেন।উৎস প্রকাশনীতে তখন প্রখ্যাত নাট্যকার মামুনুর রশিদ বসে আছেন।তরুন দাড়িয়ে দাড়িয়ে তার কিছু কথা শুনলেন।পথে যেতে যেতেও অনেকের মূখে নিজের নাম শুনলেন কিন্তু তার মনে তেমন কোন ফিলিংস আসলো না।তিনিতো আসলে এমনই।উৎস প্রকাশনীর সামনে দাড়িয়ে তখন লেখক মাসউদুল হক গল্প করছেন।তাঁর হাতে বেশ কিছু বইয়ের ব্যাগ।তরুণ এই লেখকের বইও পড়েছেন।তার পড়তে ভালো লাগে।একবার হয়তো ইচ্ছে হলো তাকে বলবেন আপনার বৃক্ষচারী গল্পটি বইয়ের অন্যান্য গল্পের তুলনায় কম আকর্ষনীয় লেগেছে তার পরও এটিকেই কেন বইয়ের নাম হিসেবে গ্রহণ করলেন।বলতে চেয়েও বলা হয়নি।তরুণ জানেন মাসউদুল হকও তাকে চেনে এবং তার নাম জানে।তার নাম কত মানুষ জানে সে হয়তো নিজেও জানে না।

একটা কফি খাওয়া দরকার।কিন্তু ভীষণ লম্বা লাইন।কফি খেতে গেলে আধাঘন্টা হয়তো দাড়িয়ে থাকতে হবে। তরুন আর অপেক্ষাকরলেন না।লেখক বলছি মঞ্চে তখন স্বকৃত নোমান আরেকজন লেখককে নিয়ে আলোচনায় বসেছেন।ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা নামাজ পড়ে বের হচ্ছে আর কেউ কেউ অপেক্ষা করছে লাইন পাওয়ার।তরুন জানে মঞ্চে আলোচনারত দুই খ্যাতিমান সাহিত্যিকও তার নাম জানে।কী আশ্চর্য কখনো পরিচয় দিতে ইচ্ছে করে না তার।একাকী ঘুরে বেড়াতে তার ভালো লাগে।আদর্শর স্টলের সামনে গিয়ে দাড়ালেন।এখানে আয়মান সাদিক,ঝংকার মাহবুব সহ আরো অনেক মোটিভেশনাল স্পিকারের বই বেরিয়েছে এবং তরুণ শুনেছে সেগুলো লাখ লাখ কপি বিক্রি হচ্ছে।তরুনের খুব ভালো লাগে।সে জানে আয়মান সাদিক কিংবা ঝংকার মাহবুবও তার নাম জানে। এমনকি তাদের বই যেসব পাঠক কিনছেন তাদের সিংহভাগই কোন না কোন ভাবেই তার নাম শুনেছে।

এই লেখাটি কেউ পড়ে নিশ্চই ভাবছেন ধুরো মিয়া কি কও! সেই তরুণ কোন তালেবর যে সব্বাই তারে চিনে অথচ দেখে নাই।

আমার মনে হয় আমি ভুল কিছু বলছি না।কথাপ্রকাশের উল্টোদিকের একটি স্টলে দাড়িয়ে নানা বিষয়ে কথা বলছেন প্রখ্যাত শিল্পী ফকির আলমগীর।তরুন তার পাশে গিয়ে দাড়ান।মনদিয়ে তার কথা শোনেন।কিন্তু কিছু বলেন না।একবার ইচ্ছে করে তাকে প্রশ্ন করবে আপনার আত্মজৈবনিক যে বইটি লিখেছেন সেটি কোন প্রকাশনীতে আছে।কিন্তু বলা হয়না।তরুণ মনে মনে ভাবেন ফকির আলমগীরতো অনেক পড়াশোনা করেন,খোঁজ খবর রাখেন।তিনিও কি তার নাম জানেন?হয়তো জানেন আবার হয়তো জানেন না।তরুণ ভাবেন সে তো এমন কেউ নয় যে তাকে সবার চিনতেই হবে।তবে সে এটুকু জানে যে বইমেলার সাথে যুক্ত সবাই তার নাম জানে।প্রতিটি স্টলের প্রতিটি সেলসম্যান তার নাম শুনেছে অন্তত একবার হলেও।আবার সে বইমেলা ঘুরে দেখতে শুরু করে।মাঝে মাঝে পছন্দ হলে বই কেনে।

দিব্য প্রকাশের স্টলে তখন বসে আছেন মঈনুল আহসান সাবের।পাঠকদের অটোগ্রাফ দিতে ব্যস্ত।তরুণের ইচ্ছে করে তাকে বলবেন আপনার কাফকা আসবে বইটি আপনার লেখা অন্য বইয়ের মত ভালো লাগেনি। আব্দুল জলিল যে কারণে মারা গেলেন কিংবা করণজল সহ অন্যান্য লেখার তুলনায় এটি নিতান্তই সামান্য হয়ে গেছে।কিন্তু ছোট মুখে বড় কথা বলা ঠিক হবেনা জেনে সে কিছু বলে না।নিজের নাম পরিচয় দিলে এই বিখ্যাত লেখকও নিশ্চই তাকে চিনবেন।

সন্ধ্যা পেরিয়ে গেছে।ফিরে যেতে হবে।যদিও মেলায় আরো অনেকটুকু সময় থাকা যায় কিন্তু তার থাকতে ইচ্ছে করলো না।এই মেলাতো তার নয়!সে তার করতে চেয়েও পারেনি।বিদ্যাপ্রকাশের সামনে সে যেমন মোহিত কামালকে দেখলেন অটোগ্রাফ দিতে তেমনি কিশোর ক্ল্যাসিক তিনগোয়েন্দাখ্যাত লেখক রবিকব হাসানকেও দেখলেন একটি স্টলে।রকিব হাসানকে তার ভীষণ ভালো লাগে।কত সাদামাটা তিনি।মেলায় তারও অগণিত পাঠক আছেন কিন্তু তিনি যখন এক স্টল থেকে অন্য স্টল মেলার এ প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ঘুরে বেড়ান তাকে কেউ চেনেনা। অথচ তার নাম জানে প্রায় সবাই।তরুন বোধহয় তার মত খ্যাতিকেই বেশি ভালোবাসে।তাকে চিনবে না কিন্তু তার নাম চিনবে এমন।

ফেরার পথে সে দেখতে পায় অগণিত পাঠক নিবার্সন কিনছেন এবং লেখক তাঁর পাঠকদের অটোগ্রাফ দিচ্ছেন এবং হাসিমূখে কারো কারো সাথে ছবিও তুলছেন।এরই মাঝে তরুণ দেখতে পায় পিরামিড,তাজমহলের গল্প সহ অনেক অসাধারণ বইয়ের অনুবাদক এবং সাহিত্যসমালোচক,লেখক,বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মোঃ আদনান আরিফ সালিম তথা সালিম অর্নবও নিবার্সন নিলেন এবং লেখকের সাথে হাসিমূখে কথা বললেন।তরুণ শুধু সব চেয়ে চেয়ে দেখলেন।বিখ্যাত এই সব লেখক কবিরা যে তার নাম জানে এতেই তরুণ খুশি।একসময় দেখলেন সালিম অর্ণব বেরিয়ে যাচ্ছেন অন্য অনেক পাঠকের সাথে।তরুন আস্তে আস্তে মেলার গেট দিয়ে বেরিয়ে গেলেন।তিনি হাটছেন শাহবাগের দিকে।গন্তব্য নিজ বাসা।

দুটো চোখ তাকে খুব অনুসরণ করলেও তিনি বুঝতে পারেননি।টিএসসির কাছাকাছি আসতেই সেই দুটি চোখের মানুষ তার পাশে পাশে হাটতে লাগলেন।আস্তে করে তরুণের নাম ধরে ডেকে বললেন ভাই কেমন আছেন!তরুন চমকে উঠলেন।হাজার হাজার মানুষের ভীড়ে কেউ তাকে চেনেনি অথচ এই ছেলেটি তাকে চিনে ফেলেছে! তিনি আশ্চর্য হয়ে জানতে চাইলেন আপনি কি করে আমাকে চেনেন?সেই আগন্তুক বললেন আপনাকে কেউ না চিনলেও আমি চিনি।আমাকে যে চিনতেই হয়।আমিতো আপনার মত সব বিখ্যাত মানুষকেই চিনি,সব লেখক কবিকে চিনি।তরুণ আরো অবাক হলেন।জানতে চাইলেন আপনি কে? আপনার নাম কি?ছেলেটি বললো আমার নাম শুনলেও আপনি চিনতে পারবেন না।আমিতো আগন্তুক মাত্র।আপনার লেখা বই আমি পড়েছি।পুরো মেলা জুড়ে আমার দুটো চোখ আপনাকে অনুসরণ করেছে কিন্তু আপনি বুঝতেই পারেননি।নালন্দার সামনে বিখ্যাত লেখক যখন আপনার সাথে ছবি তুলতে চাইলেন তখনও আমি ছিলাম।আমি জানি আপনি তার সাথে ছবি তুলতে রাজি হননি তাই আমিও আপনার সাথে ছবি তুলতে চাইবো না।

সেই বিখ্যাত তরুণ আমাকে অবাক করে দিয়ে পকেট থেকে নিজের মোবাইল বের করলেন।বললেন আপনি আমার সাথে ছবি তুলতে চান না সেটা আপনার ব্যাপার কিন্তু যে মানুষটি আমাকে চিনে ফেলেছে তার সাথে ছবি তুলতে বরং আমারই আগ্রহ হচ্ছে।ছেলেটি সবিনয়ে সেই বিখ্যাত তরুণকে বললেন আমিও ঠিক আপনারই মত।সবিনয়ে ছবি তোলার বিষয়টি এড়িয়ে যেতে চাই। নামযশে খ্যাত সেই মানুষটি মিষ্টি করে হাসি দিলেন।তাঁর সাথে হেসে উঠলো ছেলেটি।বিখ্যাত মানুষটি জানতেও পারলো না তার মত মানুষকে চিনে ফেলা ছেলেটি আমি।

প্রিয় পাঠক আপনারা কি অনুমান করতে পারেন সেই বিখ্যাত তরুণটির নাম কি?