ছোটবোনের মেহমানদারী

জেএসসি পরীক্ষার পর বেশ লম্বা ছুটি আমার হাতে।সারাদিন টিভি দেখা,ঘুরতে যাওয়া,গেমস খেলার পরও আমি চেষ্টা করি কিছুটা পড়াশোনা করতে।গল্পের বই বেশি পড়ছি তবে ক্লাস নাইনের বইও সংগ্রহ করে পড়তে চেষ্টা করছি।আবার কখনো কখনো কোন কিছুই পড়তে ইচ্ছে করেনা। এই যেমন আজকে।পড়ার টেবিলে বসে আছি কিন্তু পড়ায় মন বসছে না। অনেকক্ষণ ধরে তাই কলম নিয়ে আঁকিবুকি করছি।ওদিকে বাসায় মেহমান এসেছে।মেহমান বলতে আমার আম্মুর কলিগেরা এসেছে সাথে তাদের বাচ্চাকাচ্চা।আম্মু এর মাঝেই আমাকে দুবার ডাক দিয়ে বলেছেন শঙ্খনীল ড্রয়িংরুমে যাও মেহমানদের সাথে গল্প করো।আমি যাইনি।আম্মু নিশ্চই এ জন্য আমাকে বকবে তারপরও কেন যেন যেতে ইচ্ছে করেনি।আমার একটা পিচ্চি বোন আছে।আমার নাম নীল তাই আম্মু আমার নামের সাথে মিলিয়ে ওর নাম রেখেছিল নীলাঞ্জনা।আমি অবশ্য নীলাঞ্জনাকে ছোট্ট করে নীলা বলে ডাকি।সবাই যেমন আমার নাম শঙ্খনীল হলেও ছোট করে নীল ডাকে ঠিক তেমনি।

আম্মু ডাকার পরও যখন আমি মেহমানদের সামনে যাইনি তখন আমার আদরের বোনটাকে আম্মু বলেছে দেখোতো তোমার ভাইয়া কি করছে? আমি যখন খাতায় এলোমেলো আকিবুকি করছি এমন সময় আমার পিচ্চি বোনটা এসে বললো ভাইয়া ভাইয়া তোমার কাছে ক্রিম আছে? আমি বললাম হ্যা আছে কিন্তু ক্রিম কি করবা? সে বললো মেহমান আসছে তাই ক্রিম লাগবে! আমি বললাম মেহমান আসলে ক্রিম কেন লাগবে? মেহমান ক্রিম দিয়ে কি করবে? সে তখন বললো আরে বোকা ভাইয়া তুমি কি জানো না মেহমানকে নাস্তা দিতে হয়।আমি বললাম আরে জ্ঞানী আপু তুমি বলো মেহমানকে নাস্তা দিতে হলে ক্রিম কেন লাগবে?আমাদের নীলা তখন বললো ভাইয়া মেহমানকে নাস্তা দেব কিন্তু দেখলাম যে বিস্কুট দেব সেটাতে ক্রিম নেই। ওদিকে আম্মু বলেছে বয়াম থেকে ক্রিমওয়ালা বিস্কুট দিতে! তাই তোমার কাছে আসলাম ক্রিম নিতে যেন বিস্কুটে ক্রিম লাগিয়ে দিতে পারি। বুঝতেই পারছো প্রেসটিজের ব্যাপার বিশেষ করে আম্মুর কলিগেরা এসেছে সাথে তাদের বাচ্চাকাচ্চা। ক্রিমছাড়া বিস্কুট কি মেহমানকে দেওয়া যায়?এতে আম্মুর প্রেসটিজ থাকবে। সবাই বলবে লিপির বাসায় গিয়েছিলাম আর আমাদেরকে নাস্তার সময় ক্রিমছাড়া বিস্কুট দিয়েছে! আমি মুখটাতে গাম্ভীর্য এনে বললাম তুমিতো ঠিকই বলেছ,আম্মুর কলিগদেরকে কি আর ক্রিম ছাড়া বিস্কুট দেওয়া যায়।

আজ আমার মাথায় দুষ্টুমী ভর করলো।নীল যদি নীলাকাশে পাখি হয়ে ইচ্ছেমত ডানাই না মেলতে পারে তাহলে আর শঙ্খনীল হয়ে লাভ কী! ভাবলাম আজ না হয় একটু দুষ্টুমী করাই যাক!আমি টেবিল থেকে ক্রিমের কৌটোটা ওর হাতে দিয়ে দিলাম।তবে ওকে বললাম এই ক্রিমতো মিষ্টি লাগবে না তাহলে?নীলা বললো তুমি চিন্তা করোনা ভাইয়া আমি ক্রিমে ফ্লেভার আনার জন্য চিনি মিশিয়ে দেব।এর পর আমি অপেক্ষায় থাকলাম ওদিকে কি রিঅ্যাকশান হয় সেটা দেখার জন্য।জানি ধরা পড়লে নীলাঞ্জনা আম্মুকে সব বলে দেবে আর আম্মু আমাকে ধরবে।

আম্মু রান্না ঘরে ব্যস্ত আর নীলা একাএকাই মেহমানদের নাস্তা দিচ্ছে।এইটুকু পিচ্চি হলে কি হবে খুবই অতিথিপরায়ণ।তার আতিথেয়তায় সবাই খুব মুগ্ধ।এতোটাই মুগ্ধ যে মুখে নেওয়া ক্রিমলাগানো বিস্কুট খুব তৃপ্তিসহকারে খেয়েছে কিন্তু কিচ্ছু টের পায়নি!আমি আমার বোনকে মনে মনে বাহবা দিয়েছি।ও নিশ্চই এমন ভাবে চিনির ফ্লেভার তৈরি করেছে যে মেহমানরা বুঝতেই পারেনি তারা যে ক্রিম খাচ্ছে তা মুখে নেওয়া ক্রিম।পরদিন আম্মু অফিসে গেলে সব কলিগেরাই বিস্কুটের প্রশংসা করে বলেছে বিস্কুটের ক্রিমটা খুব সেন্টওয়ালা ছিল এবং টেষ্টও আনকমন ছিল।তবে রাতে একটু পেটে সমস্যা হচ্ছিল সবারই।বিস্কুটের ক্রিম এবং সেন্ট এই দুটি কথা আম্মুর কানে বেজেছে।খটকাও লেগেছে কিন্তু সাংবাদিক হওয়ায় আম্মু বিষয়টা চেপে গেছে।বাসায় ফিরে সবার আগে আম্মু ড্রয়িংরুমে বসে নীলাঞ্জনাকে পাশে বসিয়ে বিস্কুটের ক্রিমের বিষয়ে জানতে চাইছে।আম্মু যে মেহমানদের ক্রিমওয়ালা বিস্কুট দিতে বলেছিল! তখন নীলা বলেছে আসলে আম্মু হয়েছে কি তুমিতো আমাকে ক্রিমওয়ালা বিস্কুট দিতে বলেছিলে কিন্তু সেই সব বিস্কুটতো আমি আর ভাইয়া আগেই খেয়ে ফেলেছিলাম।পরে তুমি যখন ক্রিমওয়ালা বিস্কুট দিতে বললে তখন ভাবলাম এখন ক্রিমওয়ালা বিস্কুট কোথায় পাই?শেষে বুদ্ধি করে ভাইয়ার কাছ থেকে মুখে লাগানো ক্রিম নিয়ে তাতে চিনি মিশিয়ে নতুন ফ্লেভার বানিয়ে মেহমানদের দিয়েছি।তারাতো খুবই পছন্দ করেছে কিন্তু বুঝতে পারেনি!

নীলাঞ্জনার কথা শুনে আম্মু প্রথমে হো হো করে হেসেছে তার পর আমাকে ডেকেছে নীল এইদিকে আসো।আমিতো আম্মুর কথা শুনেই বুঝতে পারছি কি ঘটতে চলেছে।আমার কানের দিকে তাকিয়ে দেখলে যে কেউ বুঝতে পারবে আম্মু কি করেছিল।ছোটবোনের মেহমানদারীর স্মৃতি চিহ্ন এখনো আমার কানে লেগে আছে।কানদুটো বেশ লাল হয়ে গেছে।

২২ জানুয়ারি ২০১৮