চিঠিওয়ালার খোঁজে

জাজাফী

কোটালিপাড়া বাস স্ট্যান্ড থেকে একটু অদুরেই সুন্দর পরিপাটি পোষ্টঅফিস।মোবাইল ইন্টারনেটের যুগে এখন আর কেউ তেমন একটা চিঠি লেখেনা বলেই পোষ্টঅফিসটাকে পরিত্যাক্ত মনে হয়।মানুষ মনে করে চিঠি লেখা মানে সময় নষ্ট করা।যে কথা চিঠি লিখে জানাতে এক সপ্তাহ লেগে যাবে সে কথা কয়েক সেকেন্ডেই বলে দেওয়া গেলে কে আর চিঠি লেখে?পোষ্ট অফিসের ডাক বাকাসোটা তাই এখন মনে মনে হাহুতাশ করে।ওর প্রাণ নেই বলেই হয়তো কেউ সেটা বুঝতে পারেনা তবে পোষ্ট অফিসের পিওন ওবায়দুর মিয়া ঠিকই অনুভব করে।আগেকার দিনের কথা তার খুব মনে পড়ে।প্রতিদিন দুবার করে ডাক বাকসো খুললে কত যে চিঠি আসতো।কত মানুষ তাদের প্রিয়জনকে চিঠি লিখতো।সেই সব দিনের কথা মনে পড়লে ওবায়দুর মিয়ার খুব মন খারাপ হয়।

 

চিঠি আসে না বলে তেমন কোন কাজও নেই, সারাদিন বসে থেকে মোটেই ভালো লাগেনা।ক’বছর আগেও রোজ কত শত ছেলে মেয়ে সকাল বিকাল পোষ্ট অফিসে আসাযাওয়া করতো।কেউ লিখতো প্রেমের চিঠি কেউ খোজ নিতো প্রিয়জন কোন চিঠি পাঠিয়েছে কিনা আবার কেউ আসতো চাকরির আবেদন পত্র পাঠাবে বলে।দুদিন পর পর হলুদ খাম আনতে হতো,পোষ্টকার্ড লাগতো শয়ে শয়ে।রেডিওর অনুষ্ঠানগুলোতেও চিঠি লিখতো অনেকে।একটা রেডিও ছিল ওবায়দুর মিয়ার।সেই রেডিওতে কতবার পরিচিত সেই সব ছেলে মেয়ের নাম শুনেছে।এখন আর কেউ আসে না।রোজ সকালে এসে পরিস্কার পরিচ্ছন করে এবং রোজ দুবার করে ডাক বাকসো খোলে।যদিও সে জানে কেউ চিঠি দেয়নি।ঠিক একই ভাবে পালা করে ওবায়দুর মিয়া জেলা সদরে গিয়ে হলুদ খামের চিঠিবিহীন বস্তাটি কাধে নিয়ে ফিরে আসে।এ কাজে তার কোন অনীহা নেই।

বিগত কয়েক বছরে কোন চিঠি আসেনি দেখে একপ্রকার ধরেই নিয়েছিলেন আর কোনদিন চিঠি আসবে না।কিন্তু ওবায়দুর মিয়াকে অবাক করে দিয়ে সদর পোষ্টমাস্টার একদিন বললেন ওবায়দুর তোমার অপেক্ষার দিন ফুরিয়েছে।কোটালিপাড়ার ঠিকানায় ঢাকা থেকে চিঠি এসেছে।ওবায়দুর মিয়া খুশি মনে বস্তা নিয়ে ফিরে গেলেন।পোষ্টঅফিসে গিয়ে বস্তাখুলে দেখলেন সেখানে একটি মাত্র চিঠি।হলুদ খামের চিঠিটি পরম যত্নে হাতে নিয়ে প্রাপকের ঠিকানা দেখে চমকে উঠলেন।প্রাপকের ঠিকানার স্থলে নাম লেখা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।প্রেরকের নামের স্থানে লেখা রেদওয়ান,বয়স দশ,ঢাকা।

চিঠি হাতে নিয়ে হতবিহ্বল পিওন ওবায়দুর।কি করবেন এই চিঠি?কি করে পৌছে দেবেন প্রাপকের কাছে।তিনি চিঠিটি খুললেন।ছোটছোট দুটি কাচা হাতে লেখা চিঠি।

প্রিয় বন্ধু আমার,

যে বয়সে আমি তোমায় চিঠি লিখছি সে বয়সীরা সাধারণত তোমাকে দাদুভাই বলে ডাকার কথা কিন্তু আমি তোমায় বন্ধু বলে লিখছি,তুমিতো বঙ্গবন্ধু,বাঙ্গালী, তাই তুমি আমারও বন্ধু।আকাশের চাঁদকে যেমন সবাই ভালোবেসে মামা বলে ডাকে তেমনি তোমাকে আমরা ভালোবেসে বঙ্গবন্ধু ডাকি।জানি এই চিঠি তুমি হাতে পাবেনা কোনদিন। তারপরও তোমাকে লিখছি।আমি বইয়ে পড়েছি তোমার কথা।বাবা মায়ের মুখে শুনেছি তোমার কথা আর টেলিভিশনে দেখেছি তুমি হাত উচু করে বক্তৃতা দিচ্ছ।তোমার সেই বক্তৃতা এখন আমার মুখস্থ।তুমি অনেক স্বপ্ন নিয়ে যে দেশটি আমাদের জন্য রেখে গিয়েছ সেই দেশটিকে আমাদের বড়রা তোমার মত করে ভালোবাসতে পারেনি,গড়ে তুলতে পারেনি।আমিতো অনেক ছোট তাই আমিও কিছু করতে পারছিনা।তোমার শুন্যতা আমাদেরকে প্রতিদিন কাঁদায়।তুমিকি আরো একবার ফিরে আসতে পারো না আমাদের মাঝে?

ইতি তোমার বন্ধু

রেদোয়ান।

পিওন ওবায়দুরের চোখে পানি এসে গেল।বেশ কবার চিঠিটা পড়লেন।তারপর আবার যত্নকরে ঢুকিয়ে রাখলেন হলুদ খামে।মনে মনে ভাবলেন কোনদিন সময় পেলে বঙ্গবন্ধুর কবরের পাশে দাড়িয়ে রেদোয়ানের লেখা চিঠিটা পড়ে শোনাবেন।এই ঘটনার একসপ্তাহ পর তিনি অবাক হয়ে দেখলেন আরো একটি চিঠি এসেছে এবং সেই চিঠিটার প্রাপকও বঙ্গবন্ধু।প্রেরক রেদওয়ান।এই চিঠিটা আরো মায়াভরা আকুতিতে ভরপুর।চিঠি পড়ে হাপুস নয়নে কাঁদলেন ওবায়দুর।এভাবে দু’মাস গেল এবং নিয়মিত রেদোয়ানের লেখা চিঠি আসতে লাগলো।কি করবে ওবায়দুর এই চিঠিগুলো দিয়ে?তিনি ছুটির আবেদন করলেন।যে করেই হোক ঢাকায় যাবেন।খুঁজে বের করবেন রেদোয়ান নামের দশবছরের ছেলেটিকে।চাকরি জীবনে ওবায়দুর কোনদিন এক সাথে তিনদিনের ছুটি চায়নি অথচ এখন কোন কাজ নেই এমনিতেই ছুটির মত তবুও সে ছুটির আবেদন করলো।তার ইচ্ছা ঢাকাতে গিয়ে রেদোয়ানকে খুঁজবেন।রেদোয়ানের লেখা চিঠিগুলো এতো ভারী মনে হতে লাগলো যে কেবলমাত্র বঙ্গবন্ধু ছাড়া সেই ভার বহন করার ক্ষমতা আর কারো নেই।এভাবে চলতে থাকলে ওবায়দুরের চোখের সবটুকু জল শুকিয়ে যাবে।ছুটি নিয়ে জমানো টাকাগুলো সাথে করে রওনা হলো ঢাকার উদ্দেশ্যে।পরিবার বলতে ওবায়দুরের কিছু ছিলনা।একাকী জীবনে স্ত্রী সন্তানের কোন পিছুটান ছিলনা।একটা ব্যাগে কিছু কাপড় আর রেদোয়ানের লেখা চিঠিগুলি নিয়ে বাসে চেপে বসলেন।

রেদোয়ান স্কুল থেকে ফিরছিল।ফেরার পথেই পোষ্ট অফিস।টিফিনের সময় সে আরো একটি চিঠি লিখেছে।সেটি হলুদ খামে ভরে পোষ্ট অফিসের ডাকবাকসে ফেলবে বলে যখন সেখানে গিয়ে দাড়ালো দেখলো সেই ডাকবাকসোর পাশে শুয়ে আছে এক বয়স্ক লোক।পাশে তার চটের ব্যাগ।ওর মনে হলো লোকটা বুঝি ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে গেছে।মায়া হলো খুব।রেদোয়ান যখন স্কুল ব্যাগ থেকে চিঠি বের করে ডাকবাকসে ফেলতে যাবে তখন বৃদ্ধ লোকটি খুব ক্লান্ত ভঙ্গিতে উঠে বসতে চেষ্টা করলো কিন্তু পারলো না।রেদোয়ান ডাকবাকসে চিঠিটা না ফেলে লোকটিকে বসতে সাহায্য করলো।লোকটি ওরমুখের দিকে তাকিয়ে জানতে চাইলো তুমিকি রেদোয়ান?রেদোয়ান খুব অবাক হয়ে বললো হ্যা আমি রেদোয়ান কিন্তু আপনি আমাকে কি করে চেনেন?লোকটির কথা বলতে কষ্ট হচ্ছিল।হাত ধরে উঠিয়ে বসাতেই রেদোয়ান দেখলো ওর হাত লাল হয়ে গেছে।রক্ত কোথা থেকে আসলো?লোকটি অনেক কষ্টে জানালো কয়েকজন লোক ছুরি মেরে টাকাগুলো ছিনিয়ে নিয়ে গেছে।

 

আসেপাশে কেউ নেই।রেদোয়ান কি করবে বুঝতে পারছে না।লোকটিতো মারা যাবে!রেদোয়ানকে চিন্তা করতে নিষেধ করে বললো তুমি আমার পাশে বসো।তুমি কি আজও চিঠি পোষ্ট করতে এসেছিলে?রেদোয়ান আরো চমকে উঠলো।সে যে চিঠি লেখে সেটাতো লোকটির জানার কথা নয়। লোকটি ওর মনের ভাব বুঝতে পেরে খুব কষ্ট করে চটের ব্যাগ থেকে বেশ কিছু হলুদ খাম বের করলো।খামের উপরের লেখাগুলো রেদোয়ানের চেনা।ও নিজে লিখেছিল,প্রাপক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।চিঠিগুলো ওর হাতে ধরিয়ে দিয়ে আজ যে চিঠিটা ও পোষ্ট করতে চেয়েছিল সেটি হাতে নিয়ে খুলে পড়লো।চোখটা জলে ভরে উঠলো।পড়া শেষ হলে চিঠিটা ফেরত দিয়ে বললো আজ থেকে তুমি আর কখনো এই চিঠি লিখো না।এমন চিঠির ভার বইতে পারার শক্তি যে আর কারো নেই।তুমি যখন অনেক বড় হবে তখন তুমি যাকে চিঠি লিখছো তার কবরের পাশে গিয়ে দাড়িয়ে তোমার মনের কথা বলে এসো।এটুকু বলেই তিনি ঢলে পড়লেন ছোট্ট রেদোয়ানের কোলে।রেদোয়ানের একহাতে ধরা অনেকগুলো হলুদখামের চিঠি,চিঠিগুলো যাকে লিখেছিল তার কাছ থেকে একজন দূত এসে ফিরিয়ে দিয়ে গেছে।সেই চিঠির হলুদ রঙ এখন লাল হয়ে গেছে রক্তে।রেদোয়ান হাতে ধরে রাখা চিঠির  দিকে তাকিয়ে কান্না জড়িত কন্ঠে বললো প্রিয় বন্ধু আমার, তুমিকি দেখেছ যে দেশের মানুষকে তুমি স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখিয়ে স্বাধীনতা এনে দিয়েছিলে সেই দেশ কোন অবস্থায় আছে।তোমাকে যে এখন আমাদের খুবই প্রয়োজন।তুমিকি আরেকবার জন্মনিতে পারো না আমাদের মাঝে।

ছিনতাই কারীর ছুরির আঘাতে কিছুক্ষণ আগে মারা যেতে যেতে পিওন ওবায়দুর চিঠিওয়ালার কোমল হাতদুটো ধরে শেষকথা গুলো বলে যেতে পেরে খুব শান্তি পেয়েছে।আর চিঠিওয়ালা? সেই চিঠিগুলো বুকের সাথে চেপে ধরে ওবায়দুরের লাশের পাশে নিবার্ক হয়ে বসে আছে।তার কোথাও যেতে ইচ্ছে করছে না।সে কোথায় যাবে?তার মনে হলো যাবার মত কোন জায়গা নেই।

৪ মার্চ ২০১৮