লকডাউন পরিস্থিতিতে নারী নির্যাতন ও বাল্য বিবাহ বেড়েছে

করোনা ভাইরাসের বিস্তারের সাথে সাথে গোটা বিশ্ব স্থবির হয়ে পড়েছে। গৃহবন্দী আছে কোটি কোটি মানুষ।কর্মহীন হয়ে পড়া মানুষ লড়ছে জীবন বাঁচানোর সংগ্রামে।এই সময়ে তুলনামূলক ভাবে অনেক কিছুই কমে গেছে যেমন সড়ক দুর্ঘটনা,অগ্নিকান্ড এবং নারী ও শিশু নির্যাতন। কিন্তু এতে আমাদের স্বস্তি পাওয়ার কথা থাকলেও আমরা ভয় পাচ্ছি সম্প্রতিকালে জাতিসংঘের জনসংখ্যা তহবিল তথা ইউএনএফপিএর এক বৈশ্বিক প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর।

উন্নয়নের শহর বলে খ্যাত নিউইয়র্ক থেকে ইউএনএফপিএ যে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে তার শিরোনাম ছিলো “ ‘ইমপ্যাক্ট অব দ্য কোভিড ১৯ পেনডেমিক অন ফ্যামিলি প্ল্যানিং অ্যান্ড এনডিং জেন্ডার বেজড ভায়োলেন্স ফিমেল জেনিটাল মিউটিলেশন অ্যান্ড চাইল্ড ম্যারেজ’ এই প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে গবেষকরা মনে করছেন করোনা পরিস্থিতির কারণে বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশের অর্থনৈতিক খাতগুলো যেমন মুখ থুবড়ে পড়েছে।অগনিত মানুষ যেমন ঘরবন্দী হওয়ায় কর্মহীন হয়ে পড়েছে । ঠিক সেরকমই আরও ভয়ের কথা হচ্ছে এ ধরনের পরিস্থিতিতে নারীর প্রতি সহিংসতা বাড়বে। ঝুঁকিতে পড়বে নারী ও মেয়েশিশুর প্রজননস্বাস্থ্য।

ইউএনএফপিএর এই প্রতিবেদন থেকে আমরা দেখতে পিই বিশ্বের নিম্ন মধ্য আয়ের ১১৪টি দেশে প্রায় ৪ কোটি ৭০ লাখ নারী আধুনিক পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি ব্যবহার করতে পারবেন না বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফলে অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ এবং অনিরাপদ গর্ভপাতের হার বাড়বে। যেহেতু বিশ্বব্যাপি লকডাউন চলছে এবং সেটি কতদিন চলবে তা কারো ধারনা নেই ফলে করোনা ভাইরাস বিস্তার রোধে যদি এই লকডাউন ব্যবস্থা আরও ছয় মাস অব্যাহত থাকে তাহলে বিশ্বে অতিরিক্তি অন্তত ৭০ লাখ অনাকাঙ্খিত গর্ভধারণ ও অতিরিক্ত ৩ কোটি ১০ লাখ সহিংসতার ঘটনা ঘটবে। আর এতে ভুক্তভোগী হবে নারী ও শিশু।

লকডাউনের কারনে বাইরে বের হওয়ায় যেমন নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে তেমনি ব্যক্তিগত সুরক্ষার কথা বিবেচনা করেও অনেকে বাইরে বের হবে না। এর ফলে বিভিন্ন দেশের মত বাংলাদেশেও পরিবার পরিকল্পনার চাহিদা পুরণে বাধার সৃষ্টি হবে এবং স্বাস্ত্যকর্মীদের সংকট সৃষ্টি হবে পাশাপাশি স্বাস্থ্যকেন্দ্র বন্ধ হয়ে যাওয়ার মত পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে।এর ফলে সেবা দাতা এবং সেবা গ্রহীতা সংখ্যাও কমে যাবে। ফলে গৃহবন্দী নারীদের গর্ভধারনের হার যেমন বাড়বে তেমনি সহিংসতার শিকার হওয়ার হারও বাড়বে।

আমাদের দেশ একটি মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে এখনো পরিপুর্ন রুপে আত্মপ্রকাশ করতে পারেনি। যদিও আমরা কাগজে কলমে মধ্যম আয়ের দেশ তার পরও মূলত আমাদের দেশের বাস্তব পরিপ্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি আমরা নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ। এ কারণেই যে কোন দুর্যোগে আমাদের অনেক মানুষ অসহায় হয়ে ওঠে।

আমাদের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৫ শতাংশ প্রজননক্ষম যাদের বয়স ১৫-৪৯ বছর। এই জনসংখ্যার মধ্যে গর্ভধারণ করে ১৫ শতাংশ। এদের মধ্যে গর্ভকালীন জটিলতায় ভোগা নারীর সংখ্যা নেহায়েত কম নয়। এর ফলে এই অধিক সংখ্যক নারীকে অস্ত্রোপচারে সন্তান জন্ম দিতে হয় যা ৫ থেকে ১৫ শতাংশের কম নয়।

করোনা ভাইরাসের প্রকোপের কারণে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতই আমাদের দেশেও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গিয়ে গর্ভকালীন, প্রসবকালীন এবং প্রসব–পরবর্তী সেবা নেওয়ার হার কমে যাবে বলে ধারনা করেন বিশেষজ্ঞরা।স্বাস্থ্য বিষয়ক বিভিন্ন প্রতিবেদন থেকে আমরা দেখতে পাই  মায়েরা সংক্রমিত হওয়ার ভয়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যেতে চাইছেন না। আবার যে নারী কোভিড-১৯ আক্রান্ত, তাঁকে সেবা দেওয়া নিয়েও জটিলতা দেখা দিচ্ছে। এর ফলে অনেকে আক্রান্ত হয়েও সেবা নিতে যাচ্ছেনা আবার সেবা নিতে গিয়েও সেবা পাচ্ছে না। এর প্রতিটিই এক ধরনের জটিলতা বলে পরিগনিত।

উহানে করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার পর আমাদের দেশে সেটি আসতে বেশ সময় নিলেও আমরা এই দীর্ঘ সময়ে তেমন কোন প্রস্তুতি নিতে চেষ্টা করিনি। আমাদের মনে হয়েছে হয়তো খুব সহজেই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে যাবে। কিন্তু তা হয়নি এবং ফলশ্রুতিতে আমরা এখন কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছি। ইউএনএফপিএর প্রতিবেদনে যা বলা হয়েছে ঠিক সেরকম

করোনাভাইরাসের বিস্তারের ফলে বাংলাদেশে নারীর প্রতি সহিংসতা এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যঝুঁকি বেড়েছে কি না, তা নিয়ে তেমন কোনো গবেষণা হয়েছে বলে জানা নেই।তবে নির্যাতনের হার যে আগের তুলনায় বেড়েছে তা আমরা বিভিন্ন ভাবে উপলব্ধি করতে পারছি।বিশেষত করোনা ভাইরাসের প্রকোপ শুরু হওয়ার পর এই হার কমে গেলেও দিন যত গড়িয়েছে তা ক্রমাগত ভাবে আরও ভয়াবহ আকারে ধারণ করছে।সবাই যখন গৃহবন্দী সেইরকম সময়ে ঢাকা মহানগর এলাকায় গত ২৬ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত ১০ দিনে ধর্ষণ, যৌতুকের দাবিতে নির্যাতন, যৌন নিপীড়ন ও অপহরণের ২৮টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ৯টি ধর্ষণের, ৮টি যৌতুকের জন্য নির্যাতন, ৫টি অপহরণ ও ৬টি যৌন নিপীড়নের মামলা। এমন প্রতিবেদন আমরা দেশের বড় বড় পত্রিকার মাধ্যমে জানতে পেরেছি যা সত্যিই বড় উদ্বেগের কারন হয়ে দাড়িয়েছে।

নারী অধিকার কর্মীদের অনেকে দেখিয়েছেন সামান্য মাস্ক কিংবা সাবান ব্যবহারেও নারী যথাযথ অধিকার পাচ্ছে না। আবার অনেক ক্ষেত্রে অধিকার পেলেও তাদের মধ্যে সচেতনতার খুবই অভাব। এই সময়ে পারিবারিক ভাবেও অর্থনৈতিক চাপ বেড়েছে,ফলে অনেক নারীকে স্বামী প্রেসার দিচ্ছে বাপের বাড়ি থেকে টাকা আনতে। এ নিয়ে ব্র্যাক একটি জরিপ করেছিল যেখানে দেখা গেছে অংশগ্রহণকারীদের ৩২ শতাংশ বলেছেন, এই সময়ে পরিবারে এবং পাড়ায় নারীর প্রতি সহিংসতা আরও বেড়েছে।

করোনার কারনে সব কিছু বন্ধ থাকায় বাল্যাবিবাহ বন্ধের যে প্রচেষ্টা সেটাও বিঘ্নিত হচ্ছে।বিশেষত ইউএনএফপিএর প্রতিবেদন থেকে আমরা ভয়ের চিত্র দেখতে পাচ্ছি। দেশের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে দেখা যাবে মেয়েশিশুদের স্কুলে উপস্থিতি ছেলেশিশুদের চেয়ে কমে গেছে। এরপর যেকোনো উপায়েই হোক মেয়ের বিয়ে দিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হতে পারে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে। করোনা ভাইরাসে সারা বিশ্ব থমকে গেলেও বাল্য বিবাহ থামেনি।ওয়ার্ল্ড ভিশনের তথ্য অনুযায়ী, মার্চ থেকে ২৮ এপ্রিল পর্যন্ত বাংলাদেশে ২১টি বাল্যবিবাহের ঘটনা ঘটেছে।এ বিষয়ে আমাদের দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে তবেই কেবল পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে।