করোনার দিনে সাহসী বাঙালী নারী

অদেখা শত্রুর বিরুদ্ধে লড়ছে পৃথিবী। শত্রুর ছোবলে অগণিত মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। ঘাতকের আঘাতে পড়া মানুষের পাশে অনেক সময় আপনজনকেও পাওয়া যাচ্ছে না, বিশেষ করে মারা যাওয়ার পর। কিন্তু এই সময়েও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে যারা, তাদের মধ্যে নাম না জানা অনেক নারীও আছেন। সেই সব নারীর মধ্য থেকে কয়েকজন সাহসী  নারীর কথা বলবো আজ।

ঝুমু দাশ:

ঝুমু দাশ চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল টেকনোলজিস্ট (ল্যাব)। ২০১১ সালের ১ ডিসেম্বর চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যোগ দেন ঝুমু। আড়াই বছরের মাথায় সেখান থেকে বদলি হয়ে আসেন সাতকানিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। তাঁর শ্বশুরবাড়ি চট্টগ্রাম নগরের পতেঙ্গার কাটগড় এলাকায়। স্বামী পুলিশের চাকুরে। ঝুমু এখন থাকছেন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কোয়ার্টারে। এই লেখাটি যখন লেখা হচ্ছে তখন পর্যন্ত তিনি হাসপাতালে অন্তত ৮০ জন সন্দেহভাজন করোনা রোগীর নমুনা সংগ্রহ করেছেন। আর বাড়ি বাড়ি গিয়ে নমুনা নিয়েছেন ১২ জনের।পরিবারের লোকেরা কাজ থেকে ইস্তফা দিতে বললেও তিনি সাহসের সাথে বিপদের দিনে মানুষের পাশে দাড়িয়েছেন। যেহেতু কাজটি ঝুঁকিপূর্ণ আর এই ভাইরাস একজন থেকে আরেকজনের শরীরে সংক্রমিত হতে পারে, তাই ঝুমু দাশ দুই শিশুসন্তানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চাইলেন। পাঁচ বছর দুই মাস বয়সী মেয়ে ও দুই বছর দুই মাস বয়সী ছেলেকে পাঠিয়ে দিলেন মায়ের বাড়ি। এরপর নেমে পড়লেন কাজে।তিনি মনে করেন‘সৈনিক পালিয়ে গেলে বেইমান হিসেবে চিহ্নিত হবে’। তিনিতো একজন অকুতোভয় সৈনিক। আমাদের পক্ষ থেকে তাকে স্যালুট জানাই।

সাঈদা আরা

সাঈদা আরা নার্সিং পেশায় কাজ করেন নিউইয়র্কের নর্থশোর এলআইজে হাসপাতালে। বাবা–মা থাকেন দেশে। ২০১৩ সালে আমেরিকায় আসেন তিনি। নার্সিংয়ে পড়াশুনা শুরু করেন। জ্যামাইকা এলাকায় অন্য একটি পরিবারের সঙ্গে একাই থাকেন সাঈদা। ২০১৬ সালে যোগ দেন নার্সিং পেশায়। নগরের একপ্রান্তে শ্বেতাঙ্গবহুল এলাকার বিশেষায়িত হাসপাতালে স্পেশাল কেয়ারিং ইউনিটের দায়িত্বে আছেন তিনি।করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের সেবা দিতে গিয়ে নিজে আক্রান্ত হয়েছেন। এরপর থাকতে হয়েছে আইসোলেশনে। লড়াই চালিয়েছেন নিজ দেহের করোনাভাইরাসের সাথে। তবে ২৪ দিনের লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত জিতেছেন তিনি। সুস্থ হয়ে আবার লড়াই শুরু করলেন অন্যদের সুস্থ করতে। নিজের জীবনের কথা না ভেবে আবার কাজে যোগ দিয়েছেন। হাসপাতালে করোনায় আক্রান্ত রোগীদের পাশে দাঁড়িয়েছেন।

সাইয়েদা জেরিন ইমাম

প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস নিয়ে যখন সবাই ভীত সন্তস্ত্র, ঠিক তখনি সাহসিকতার পরিচয় দিলেন সৈয়দা জেরিন ইমাম।করোনা ভাইরাসের চীনের উৎপত্তিস্থল হুবেই প্রদেশের রাজধানী উহান শহরে গিয়ে করোনা ভাইরাসে আক্রান্তদের সেবা করতে চেয়ে চীনা দুতাবাসে আবেদন করেছিলেন সাইয়েদা জেরিন ইমাম। দূতাবাসের কর্মকর্তারা খুব অবাক হয়েছিলেন। যেখানে অনেক চীনা চিকিৎসক সেবা দিতে অস্বীকার করেছেন সেখানে তিনি স্বেচ্ছায় এ কাজে অংশ নিতে চান। বর্তমানে বাংলাদেশি এই চিকিৎসক চীনের জিনান প্রদেশের শানডং বিশ্ববিদ্যালয় পিএচইডি করছেন।

 

জহিরন বেওয়া

 

বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতা হার মেনেছে জহিরন বেওয়ার কাছে। বয়স ৯০ পেরিয়ে গেছে। তবুও কমেনি এই নারীর উদ্যম। বাইসাইকেল চালিয়ে গ্রাম থেকে গ্রামে ছুটে চলেন তিনি।বাড়ি লালমনিরহাটে। প্রত্যন্ত অঞ্চলের নারীদের পরিবার পরিকল্পনাসহ নানা স্বাস্থ্য পরামর্শ দেন তিনি। এলাকায় তার পরিচিতি ছড়িয়েছে ‘বাংলার নানি’ নামে।১৯৭৩ সালে পরিবার পরিকল্পনা বিষয়ে ধাত্রীবিদ্যায় প্রশিক্ষণ নেন। এরপর বিভিন্ন সময় স্থ্যকর্মীদের সঙ্গে কাজ করে অর্জন করেন অভিজ্ঞতা। প্রথমে সামান্য মজুরিতে চুক্তিভিত্তিক চাকরি করলেও এখন কোনো স্বার্থ ছাড়াই কাজ করছেন মানবসেবায়।পরিবার পরিকল্পনা বিষয়ে পরামর্শ, কিশোরীদের মাঝে সচেতনতা সৃষ্টি ও গর্ভবতী নারীদের স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ায় নিয়োজিত আছেন।মানবসেবা যার নেশা তার কাছে বয়স কোনো বাধা নয় তারই নজির জহিরন বেওয়া।

দৈনিক আমাদের সময় পত্রিকায় প্রকাশিত 17 মে 2020