আমাদের গৃহবন্দী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা ব্যবস্থা

ভবিষ্যতের ভাবনা ভাবাই জ্ঞানীর কাজ। কিন্তু আমরা ভবিষ্যতের ভাবনার দিকে না গিয়ে বরাবরই অতীত নিয়ে পড়ে আছি।যেন আমাদের অতীতটাই সব। আর এ কারণেই আমরা নানা ভাবে বিপদে পড়ছি। ইংরেজীতে একটি কথা আছে “প্রিভেনশন ইজ বেটার দ্যান কিওর”। কিন্তু আমরা বরাবরই সেটাকে উল্টো করে ভাবছি। আমরা কখনো প্রিভেনশনকে গুরুত্ব না দিয়ে কিওরকে গুরুত্ব দিয়েছে। রোগ হলে চিকিৎসা দিচ্ছি কিন্তু রোগ যেন না হয় সেটা নিয়ে কাজ করছি না। বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ ধনী ওয়ারেন বাফেট বলেছিলেন “ আগে জমাও তার পর যদি কিছু থাকে তবে  তা খরচ করো” কিন্তু আমরা আগে খরচ করি তার পর যদি কিছু থাকে তবে তা জমাই নতুবা সেটাও নতুন কোন ভাবে খরচ করতে চেষ্টা করি। এতো কথা বলার মূল উদ্দেশ্য করোনা ভাইরাসে গৃহবন্দী সময়ে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে কিছু কথা বলা।

উপরের সবগুলো উদাহরণ আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা ব্যবস্থার সাথে হুবহু মিলে যায়। আপদকালীন সময়ে কিভাবে শিক্ষা কার্যক্রম নির্বিঘ্নে পরিচালনা করা যাবে তা নিয়ে আমাদের শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা কোনদিন চিন্তা করেছেন বলে মনে হয় না। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের কথা মোটা দাগে বলা যায়। করোনা ভাইরাসের কারনে গোটা বিশ্বের মত বাংলাদেশের কোটি কোটি শিক্ষার্থী যখন মাসের পর মাস গৃহবন্দী তখন খুব স্বল্প পরিসরে হলেও প্রাথমিক,মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের অনলাইন ক্লাস শুরু করার যে সিদ্ধান্ত ছিলো তা অন্তত প্রসংশার দাবীদার।

কিন্তু যখন প্রশ্ন আসলো বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের নিয়ে তখন দেখা গেলো আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় গুলো যে অনেক দিক থেকে পিছিয়ে আছে তা আবারও প্রমানিত হলো। অধিকাংশ সরকারী বিশ্ববিদ্যালয় বলছে তাদের অনলাইন ক্লাস নেওয়ার তেমন কোন প্রস্তুতি নেই, পাশাপাশি কারীগরী সুবিধাও নেই। এরকম একটি কথা বলতেও তাদের মুখে আটকায়নি যে, বিশ্ববিদ্যালয় নামধারী হয়েও তার আধুনিক সুযোগ সুবিধা নেই। আর যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের র‌্যাংকিং প্রকাশ করা হয় তখন দেখা যায় দেশের কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম তালিকায় থাকা এক হাজার বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যেও নেই!শুধু ভালো রেজাল্ট দিয়ে তো বিশ্ববিদ্যালয় র‌্যাংকিং হয় না বরং বিশ্ববিদ্যালয়ে নানা রকম সুযোগ সুবিধাও বিবেচনা করা হয়।

আমরা যে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখছি সেই ডিজিটাল বাংলাদেশের মধ্যে এক খন্ড অন্ধকার ভূখন্ড হিসেবে সরকারী বিশ্ববিদ্যালয় মাথা উচু করে দাড়িয়ে আছে। আমি কোন ভাবেই বিশ্ববিদ্যালয়কে ছোট চোখে দেখছি না বা কটাখ্য করছি না বরং আমি বলতে চাইছি বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে আধুনিক সুযোগ সুবিধা তৈরি করা উচিত। বলা হচ্ছে সরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া অসংখ্য শিক্ষার্থী এখন গ্রামে আছে এবং তাদের ইন্টারনেট নেই! অথচ আমরাই পত্র পত্রিকা থেকে জানতে পারি দেশের সবর্ত্র ফোরজি নেটওয়ার্ক বিস্তার লাভ করেছে। গ্রামীন ফোনের টিভি বিজ্ঞাপনে দেখা যায় গভীর জঙ্গলেও ফোরজি নেটওয়ার্ক আছে। সুতরাং শিক্ষার্থীরা প্রত্যন্ত অঞ্চলে থাকলেও তাদের ইন্টারনেট সুবিধা পাওয়ার কথা। যদি না পায় তবে দেশে ফোরজি নেটওয়ার্ক বিস্তার ঘটেছে এই কথাটা যে মিথ্যা সেটা প্রকাশ করা উচিত।

প্রশ্ন আসতে পারে ইন্টারনেট কেনার জন্য অর্থ ব্যয় হবে তা অনেক শিক্ষার্থীর নেই। এখানে বলতে চাই একই শিক্ষার্থী যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকতো তখন তার হাত খরচ,মোবাইল খরচ,খাবারের খরচ বাড়ি থেকেই বহন করতো বা কেউ কেউ টিউশনী করতো। টিউশনী করলেও প্রত্যেকের বাড়ি থেকে কিছু না কিছু টাকা সে পেতো। এখন যেহেতু বাড়িতেই অবস্থান করছে তাই খাবারের জন্য বরাদ্দকৃত টাকা বেচে যাচ্ছে। সেখান থেকে সে অনায়াসে ক্লাসকরার জন্য যতটুকু ইন্টারনেট প্রয়োজন তা নিশ্চই কিনতে পারে।প্রশ্ন আসতে পারে  ইন্টারনেট কিনলেও আধুনিক মোবাইল তার নাও থাকতে পারে। আমিও এটা স্বীকার করি যে সবার স্মার্ট ফোন নেই কিন্তু যে যে গ্রামে থাকে সেই গ্রামে অগনিত মানুষের স্মার্ট ফোন আছে এবং অতন্ত্য নিষ্ঠুর না হলে যে কেউ ক্লাস করার জন্য তার মোবাইল ফোনটা দিয়ে দিবে। এমনতো নয় যে রাত দিন চব্বিশঘন্টাই ক্লাস হবে।

মূলত এসব কোন বিষয় না। আমরা বরং বলতে পারি আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের কারীগরী দক্ষতা এবং সুযোগ সুবিধার বড়ই অভাব। আমাদের যেমন নেই মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম তেমনি নেই ভালো স্পিডের ইন্টারনেট। শুধু মাত্র ক্লাস পরীক্ষায় ভালো সিজিপিএধারীদের আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক তৈরি করি যাদের অনেকেই পড়ার বিষয়টার বাইরে অন্যান্য বিষয়ে তেমন কোন ধারনাই রাখে না। তবে এমনও অনেক শিক্ষক আছেন যারা বাইরের বিষয় গুলিতেও সমান দক্ষ। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ে আধুনিক সুবিধা না থাকলেও তারা চাইলে অনায়াসে নিজেদের ফেসবুক পেজ বা আইডি বা ডিপার্টমেন্টের ফেসবুক পেজের মাধ্যমে ঘরে বসেই ক্লাস নিতে পারেন। অন্যদিকে এখন জুম সহ অনেক সাইটের মাধ্যমে ক্লাস নেওয়ার সুযোগ আছে। এ ক্ষেত্রে দরকার সদিচ্ছা এবং আগ্রহ।

করোনা কালিন সময়ে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরা যতটা ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে তা কাটিয়ে উঠতে কেউ কেউ বলেছেন সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও ক্লাস নিয়ে সেটা কাটিয়ে উঠবেন যা আদতে যুক্তিযুক্ত নয়। পড়াশোনা ও অনেকটা ওষুধের ডোজের মত। একবারে সবগুলো ট্যাবলেট খেয়ে ফেললে কাজ হবে না বরং পরিমান মত সময়ে সময়ে দিতে হবে। এই সময়ে শিক্ষার্থীরা ঘরে বসে অলস সময় কাটাচ্ছে। এমন নয় যে তারা ঘরে বসে পড়াশোনা করছে। মূলত একাডেমীক প্রেশার না থাকলে সেভাবে পড়াশোনা করা হয় না। শিক্ষার্থীদের উপর একাডেমীক চাপ থাকলে তবেই তাদের পড়াশোনা নিয়মিত হয় নতুবা সব থমকে যায়।

আধুনিক সুযোগ সুবিধা না থাকায় বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে অনলাইন ক্লাস পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে না এই ধারনা থেকে এখনি বেরিয়ে আসা উচিত। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা প্রথম শ্রেনীর নাগরিক এবং তাদের বাসায় ভালো মোবাইল,ইন্টারনেট লাইন থাকার কথা। সুতরাং তারা চাইলেই ঘরে বসে তাদের ক্লাসগুলো অনায়াসে পরিচালনা করতে পারেন। একই সময়ে যদি কোন শিক্ষার্থী অনলাইন ক্লাসে অংশ নিতে না পারে তবে সে অন্য যে কোন সময়ে ভিডিওগুলো দেখতে পারবে। এটাতো পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলেও অনেক শিক্ষার্থী ক্লাসে অনুপস্থিত থাকতে পারতো এমন। আমাদের মনে রাখতে হবে একবার সেশনজট শুরু হলে তার রেশ বছরের পর বছর চলতে থাকে। এই ব্যাচের শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা হচ্ছেনা বলে পরের ব্যাচের পরীক্ষা পেছাতে হয়। ফলে দেখা যায় এভাবে ক্রমান্বয়ে শিক্ষাব্যবস্থা নাজুক হয়ে পড়ে। যে সব শিক্ষক অনলাইন ক্লাস নিতে সাময়িক অসুবিধায় পড়বেন তাদেরকে শিক্ষার্থীদের অনেকেই ক্লাস নেওয়ার ব্যবস্থা করে দিতে পারে বলে আমি মনে করি। আপনারা সিদ্ধান্ত নিন যে অনলাইন ক্লাস শুরু হবে তার পর বলুন যে কিভাবে অনলাইন সেটাপ করতে হয় সেটা জানা দরকার। একদল শিক্ষার্থী অবশ্যই আপনাদের সাহায্য করবে।

এতোদিন কি ছিলো কি ছিলো না সেটা আর ভাবার দরকার নেই। আগেই বলেছি অতীত নিয়ে আমাদের পড়ে থাকার যে অভ্যাস আছে তা এখনি পরিত্যাগ করতে হবে। ভবিষ্যতের কথা ভাবতে হবে। করোনা থেকে অন্তত এটুকু শিক্ষা নেওয়া উচিত যেন আগামী দিনে আবার কোন দুযোর্গ আসলে আমাদের যেন বলতে না হয় যে আমাদের প্রস্তুতি নেই। কোন কোন হাউস টিউটর পযর্ন্ত ঘরে বসে অনলাইনে টিউশনী করছে সেখানে বিশ্ববিদ্যালয় কেন পারবে না এটা আমার বোধগম্য নয়। কোন কিছুই কঠিন নয় শুধু একটুখানি সদিচ্ছা থাকা দরকার। অগণিত শিক্ষার্থীর ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করে অনলাইন ক্লাস শুরু করাটা সময়ের দাবীই নয় অধিকারও বটে।

  • জাজাফী

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

13 মে 2020