করোনায় অসহায় বার্মিজ মার্কেটের নারীরা

বাংলাদেশে শ্রমজীবী মানুষের এক বৃহদাংশই নারী।প্রতিটি সেক্টরে নারীদের অংশগ্রহণ বেড়েই চলেছে।উদ্যোক্তা হিসেবেও নারী সমান ভাবে এগিয়ে যাচ্ছে।বাংলাদেশের উপজাতীয়দের মধ্যে বিরাট একাংশই নারীদের উপার্জনের উপর নির্ভরশীল।পযর্টন নগরী কক্সবাজারে গেলে বিষয়টি খুব করে চোখে পড়ে।সমুদ্র সৈকতে ঘুরতে আসা পযর্টকদের এক বিরাট অংশ কেনাকাটার জন্য বার্মিজমার্কেট গুলোতে বিচরণ করে এবং শতকরা আশি ভাগ বার্মিজ মার্কেটই নারীদের দ্বারা পরিচালিত। করোনা ভাইরাসের প্রকোপ শুরু হওয়ার পর সরকারী সিদ্ধান্তে বিশেষ দোকানপাট ছাড়া বাকি সব বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

বার্মিজ মার্কেটও এর আওতায় পড়েছে। যেহেতু এই মার্কেটের ক্রেতাদের প্রায় সবাই পযর্টক এবং এই মুহুর্তে পযর্টক শুন্য কক্সবাজার তাই তাদের মার্কেট খোলা থাকলেও কোন কাজে আসতো না। বিশ্ব অর্থনীতি নাজুক পরিস্থিতিতে পড়েছে তারই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের মত নিম্ন আয়ের দেশের খেটেখাওয়া মানুষগুলোর দুর্ভোগ বেড়েছে বহুগুন। কারখানার শ্রমিকেরা যেমন বেকার হয়ে বসে  আছে তেমনি বার্মিজ মার্কেটের নারীরাও গৃহবন্দী। কেমন কাটছে তাদের দিনকাল? নিশ্চই ভালো নয়। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সদস্য হওয়ায় এমনিতেই উপজাতীয়রা অনেক পিছিয়ে আছে তার উপর এই দুর্যোগের সময়ে নারীর আয়ের উপর যে সব সংসার চলতো তারা ভাষাহীন দুর্ভোগে পড়েছে।

বার্মিজ মার্কেটের সুচনা স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদ্বয়ের আগে। ১৯৬২ সালে এক রাখাইন উদ্যোগী মহিলা নারী, টেকপাড়াস্থ বার্মিজ প্রাইমারী স্কুল সংলগ্ন তার নিজ বাড়ীতে খুবই ছোট পরিসরে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত রাখাইন হস্তশিল্পের কিছু মালামাল- চাদর, কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ, চুরুট, পুরুষদের লুঙ্গি আর টুকিটাকি জিনিস পত্রের পসরা সাজিয়েছিলেন। কক্সবাজার বেড়াতে আসা দেশী বিদেশী পর্যটকরা রাখাইন নারীর পসরায় কী আছে, তা নেড়েচেড়ে দেখতো। সেখান থেকেই আজকের এই সর্বজন স্বীকৃত বার্মিজ স্টোরের সূচনা।পর্যটকদের চাহিদা অনুধাবন করে উনাং “কক্সবাজার কটেজ ইন্ডাস্ট্রিজ” নামে বাণিজ্যিকভাবে একটি স্টোর খোলেন নিজ বাড়ির সামনে, তারপর একে একে গড়ে উঠে টিন টিন বার্মিজ স্টোর, রাখাইন স্টোর, উমে স্টোর, নূরানী এম্পোরিয়াম, বিবি ফ্যাশন ডায়মন্ড স্টোর প্রভৃতি যা বার্মিজ স্টোর হিসেবে পরিচিতি লাভ করতে থাকে।

যদিও শুরুতে স্টোরগুলোতে বার্মিজ কোনো পণ্য ছিল না। পরবর্তীতে বার্মিজ পণ্য যেমন- লুঙ্গি, থামি, স্যান্ডেল, আচার, বাম জাতীয় ভেষজ, স্নেখা- এক প্রকার প্রসাধন, বিভিন্ন জাতের পাথর এবং বার্মিজ হস্তশিল্পের- কাঠের ও ঝিনুকের তৈরী বিভিন্ন সৌখিন জিনিস সংযোজন হতে থাকে এবং “বার্মিজ স্টোর” নামের পরিপূর্ণতা লাভ করে।

রাখাইন তরুণী উ খিং চ জানান, ‘আগে সারা দিনে ২০ থেকে ৪০ হাজার টাকার মালামাল বিক্রি হতো এবঙ তা থেকে ভালো লাভ হত। করোনা ভাইরাসের কারণে সব বন্ধ হয়ে গেছে।ফলে লাভতো দূরে থাকুক সব রকম উপার্জন বন্ধ।দোকানের আয় দিয়েই তাদের সংসার চলতো এখন এই পরিস্থিতি আরও দীর্ঘস্থায়ী হলে বিপদ আরও বাড়বে। অন্য আরেক রাখাইন তরুনী উ চেং খুব চিন্তায় আছেন। সারা বছর পযর্টক থাকার কারণে যে পরিমান বিক্রি হতো তা এখন পুরোপুরি বন্ধ পাশাপাশি সামনেই ঈদ।

ঈদের সময়টাতে স্থানীয়রাও কেনাকাটা করতো যা তাদের ভালো মুনাফা এনে দিতো। এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে এমন একটি উৎসবকে সামনে রেখেও তাদের ঘরে কাটাতে হবে।সেনাবাহিনীর মাধ্যমে নানা সময়ে অল্পবিস্তর সহযোগিতা এই অঞ্চলে দিয়ে থাকলেও তা অপ্রতুল।বিশেষত নারীদের আয় অনেক ক্ষেত্রেই পুরুষের চেয়ে কম হয়ে থাকে।বার্মিজ নারীদের একমাত্র অবলম্বন ছিলো এই মার্কেটগুলো।

শুধু তাই নয় অধিকাংশ বিক্রয়কর্মী বেতন ভুক্ত ছিলো। দোকান মালিকের সামর্থ নেই তাদের কাজ না করিয়েও বেতন দেওয়ার। ফলে বার্মিজ মার্কেটের নারীরা ঘরে বিষন্ন দিন কাটাচ্ছে। পরিবারের আয়ের প্রধান উৎস তারা।এমনকি পরিস্থিতি যদি খুব শিঘ্রই স্বাভাবিকও হয় তবুও বার্মিজ মার্কেটের নারীদের ঘুরে দাড়াতে অনেক সময় লেগে যাবে। অনেকেই দীর্ঘদিন গৃহবন্দী থেকে জমানো পুজি থেকে খরচ করে পুজি হারা হয়ে ব্যবসা গুটিয়ে নিবে।ফলে সে নিজে যেমন ক্ষতিগ্রস্থ হবে তার পাশাপাশি যে কর্মচারিগুলো ছিলো তারাও কাজ হারাবে।

সব মিলিয়ে সমুদ্র সৈকত ঘুরতে আসা পযর্টকদের জন্য পসরা সাজিয়ে রাখা বার্মিজ মার্কেটের নারীরা কেউ ভালো নেই।পুরো পৃথিবী যেখানে ভালো নেই সেখানে তাদেরও ভালো থাকার কথা নয় কিন্তু তারা বোধহয় আরও একটুখানি বেশি কষ্টে আছে।

23 এপ্রিল 2020

দৈনিক আমাদের সময় পত্রিকায় প্রকাশিত