আমার সাধারণ বাবার গল্প

বাবাদের জন্য একটি দিবস পালিত হচ্ছে এবং কমবেশি অনেকেই তাদের বাবাকে নিয়ে লিখছে। আমার বাবাকে নিয়ে লেখার মত তেমন কিছু হয়তো নেই, আমার বাবা হয়তো অন্যদের বাবার মত সেরা বাবা নন তার পরও আমার বাবার অনেকগুলো গুণ আছে। বন্ধুদের সবার জানার সুবিধার্থে সেগুলো থেকে কিছু তুলে ধরতে চেষ্টা করছি। এই লেখাতে যা কিছু লিখছি সব পাইপাই সত্য।

আমার বাবা সত্যিকারের অলরাউন্ডার। আমার বাবা যত বিষয়ে অভিজ্ঞ আমার পরিচিত আর কারো বাবা ততো বিষয়ে অভিজ্ঞ কি না তা আমার জানা নেই।। হ্যা অনেক বিষয় আছে যা আমার বাবার চেয়ে অন্যদের বাবা হয়তো ভালো জানেন কিন্তু অলরাউন্ডার বিবেচনায় আমার বাবার কথা আামি সবাইকে বলতে ভালোবাসি।

১। শহরে আমাদের কোন বাড়ি নেই। থাকার মত যে বাড়িটা সেটা গ্রামে। আমরা শহরে ভাড়া বাসায় থাকি। গ্রামে আমাদের বেশ কিছু আবাদি জমি আছে বাবা সেখানে নিজ হাতে ফসল ফলান। বাবার সাথে সাথে আমি নিজেও সব শিখে নিয়েছি। বাবা হাল চাষ করেন,কোদাল দিয়ে মাটি কাটেন। সার প্রয়োগ করেন,বীজবপন করেন। আমি নিজে বাবার সাথে সাথে পিয়াজ,রসুন,মরিচ,বেগুন,হলুদ,ডাল,ঢেড়শ সহ অন্যান্য শাক সবজি চাষ করা শিখেছি এবং কখনো কখনো নিজে বাজারে গিয়ে মরিচ,বেগুন বিক্রি করেছি।

২। আশেপাশে দুই তিন গ্রামে যত বাচ্চা আছে বাবাকে সবাই খুব ভালোবাসে। তাদের যখন যেরকম ঘুড়ি বানানো দরকার আমার বাবার কাছে চলে আসে আর বাবা তাদেরকে ঘুড়ি বানিয়ে দেন। আমিও বাবার কাছ থেকে দুই তিন রকম ঘুড়ি বানানো শিখেছি। বাবার কাছ থেকে সাইকেল চালানো শিখেছি,মোটর সাইকেল চালানো শিখেছি,সাতার শিখেছি,গাছে ওঠা শিখেছি।

৩। আমাদের বাড়িতে যে পাকা ঘর আছে তার উপরটা টিনের। আমার বাবা নিজে রাজমিস্ত্রি হিসেবে সেই ঘরের কাজ করেছেন আমি বাবাকে সহযোগিতা করেছি। সেই ঘরে যে পালং (খাট) আছে,যে চেয়ার টেবিল আছে,জানালা আছে সব আমার বাবার নিজ হাতে বানানো।আমি বাবাকে হেল্প করেছি। আমাদের গ্রামে মাত্র এক বছর হলো বিদ্যুৎ এসেছে। যে সময়ে বাবা ফার্নিচারের কাজ করেছেন সব নকশা করতে হয়েছে হাতে খোদাই করে। খাটের বেলুনগুলো রোলারগুলো নকশাগুলো করতে একধরনের টানা মেশিন বানানো হয়েছে। রশি বেধে আমি সেটা টেনেছি আর বাবা নকশা তৈরি করেছেন,রোলার তৈরি করেছেন।

৪। আমার বাবা নিজ হাতে মাছ ধরার জাল বুনতেন এবং সেটা দিয়ে খাল বিলে মাছ ধরতেন। আমি নিজে বাবার কাছ থেকে মাছ ধরার সেই জাল বুনা শিখেছি। মাছ রাখার জন্য যে পাত্র ছিলো সেটা বাশ কেটে বানানো হতো যেটাকে বলা হয় খালোই। বাবা নিজে সেটা বানাতেন। আমি বাবার সাথে বৃষ্টির দিনে মাছ ধরতে যেতাম।
৫। তখন গ্রামে ছাতা ছিলো না। মাথোল নামে একটা জিনিস তৈরি করা হতো যা বাশ এবং ছন ব্যবহারে তৈরি করা হতো। বাবা নিজ হাতে তা তৈরি করতেন এবং মাথার সাথে আটকে রাখার জন্য বেত ব্যবহার করা হতো। বাড়িতে ময়লা ফেলার বা কোন কিছু বহন করার জন্য বাশের ঝুড়ি বানাতেন বাবা। ছনের ঘরের বেড়া দেওয়া হতো পাটকাঠি দিয়ে। সুন্দর নকশাওয়ালা বেড়া বানাতেন বাবা নিজে। কয়েক রকম বেড়া তৈরি করতে পারেন আমিও বাবাকে সহযোগিতা করতাম এবং দুই রকম বেড়া তৈরি করা শিখে নিয়েছি।
৬। আমার বাবা ছোটদের খুব ভালোবাসেন। এমনকি এখনো খুব ভালোবাসেন। আমার বাবা অপেক্ষাকৃত আর্থিক অসচ্ছল এক বন্ধুকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়িয়েছেন নিজের খরচে। সে ছিলো বাবার বয়সে ছোট বন্ধু। আমাদের পুরো ইউনিয়নের মধ্যে সেই মানুষটিই প্রথম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পেয়েছিল।
৭। আমার বাবা খুব ঘুরতে পছন্দ করেন।দেশের বাইরে যাওয়ার সুযোগ না হলেও বাবা আমাকে দেশের মধ্যে অন্তত ৪৬টি জেলা ঘুরিয়ে দেখিয়েছেন সেটাও আমার ক্লাস টুয়েলভের আগেই।শুধু মাত্র রাজশাহী বিভাগ ব্যতিত বাকি বিভাগের দর্শনীয় স্থানে বাবা আমাকে সাথে করে নিয়ে গিয়েছেন।
৮। বাজারে যতরকম শৌখিন দ্রব্যাদি আসতো বাবা সাথে সাথে সাধ্যের মধ্যে থাকলেই সেটা আমার জন্য কিনে আনতেন। এই যেমন আধুনিক কালের ছেলে মেয়েরা এমন অনেক কিছুই আছে যা দেখেনি বা শোনেনি। একসময় এমন একধরনের কলম বিক্রি হতো যার লেখার নিবের ওখান থেকে আলো বের হতো। রাতে অন্ধকারেও লেখা যেত। আবার একধরনের কলম ছিলো লিখলেই সেন্ট বের হতো। বাবা সেগুলো কিনে দিতেন।
৯। ঘোড় দৌড়,লাঠি খেলা,নৌকা বাইচ সব মেলায় বাবা সাথে করে নিয়ে যেতেন। নাগরদোলাতে চড়াতেন। সার্কাস দেখাতেন।
১০। বাবা আমাকে সব সময় সাথে করে মসজিদে নিয়ে যেতেন এবং শিক্ষা দিয়েছেন ভালো ভালো সব বিষয়। সন্ধ্যার অন্ধকার ঘনিয়ে আসার আগেই বাড়ি ফেরার যে নির্দেশ তিনি দিয়েছিলেন তা আমি অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছি।
১১। আমার বয়স যখন তের বা চৌদ্দ বছর আমার বাবা আামাকে শহরে নিয়ে গেলেন। কাপড়ের দোকানে গিয়ে আমাকে আন্ডারওয়্যার অব্দি কিনে দিতে দ্বিধা করেন নি।যেহেতু গ্রামে ছিলাম তাই গ্রামের মানুষ এসব বিষয়ে তেমন একটা অভিজ্ঞ নয়।
১২। আমার বাবা খুব বেশি ধুমপান করতেন। প্রতিদিন দুই তিন প্যাকেট সিগারেট লাগতো। একদিন বাবা তার বন্ধুর সাথে সিগারেট খাচ্ছিলেন আমি গিয়ে সেই চাচ্চুকে বলেছিলাম চাচ্চু আমাকেও একটা দাও আমি খাবো। এটা শোনার পর থেকে বাবা আর কোন দিন সিগারেট খান নি।
১৩। আমার বাবা পিকনিক খুব পছন্দ করেন। প্রতি মাসেই এক দুবার বড় বড় রাজহাস কিনে এনে পিকনিক করতেন এবং মাঝে মাঝে খাসি কিনতেন। আমার মায়ের হাতের রান্না খুব ভালো। বাবার সব বন্ধুরা খুব পছন্দ করে। তারাই আব্দার করতো পিকনিক হবে আমাদের বাড়িতে।
১৪। কোরবানীর ঈদের সময় গ্রামে গরু জবাই করার সময় বাবা নিজ হাতে জবাই করে দিতেন এবং নিজেদের গরু জবাই থেকে শুরু করে চামড়া ছড়ানো এবং গোস্ত কাটার কাজ বাবা নিজ হাতে করেন। আর আমি অবাক হয়ে দেখি বাবার হাতে শরীরে খুব বেশি শক্তি না থাকলেও অন্যদের চেয়ে অন্তত তিনগুন দ্রুত কাজ করতে পারেন।
১৫। আমার বাবার খুব ভালো এক বন্ধু একবার বাবাকে খুব মেরেছিল। এটা জানার পর আমার নানা বাড়ির লোকেরা বাবার সেই বন্ধুকে ধরে নিয়ে যেতে এসেছিল। আমার মামারা খুব শক্তিশালী ছিলো এবং পুরো জেলার লোক তাদের ভয় পেতো। মামারা যখন বাবার সেই বন্ধুকে ধরে নিয়ে যেতে এসেছিল সেটা দেখে বাবার সেই বন্ধু জেলা ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিল। তার পর সে সিঙ্গাপুর গিয়ে সেটেল হয়েছিল। বহুবছর পর বাবার সেই বন্ধু তার ছেলে মেয়ে নিয়ে দেশে আসলে সেই ছেলেমেয়ে আমার সাথে ঘুরতো তবুও বাবা কখনো রাগ করতেন না। যদিও সেই বন্ধুর সাথে বাবার কোন দিন আর কথা হয়নি।

১৬। আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে কি নিয়ে পড়বো,কোথায় পড়বো সেসব বিষয়ে বাবা কোন হস্তক্ষেপ করেন নি বরং আমি যা চেয়েছি তাই করতে পেরেছি। বাবা শুধু বলেছিলেন আমার যে সম্মান আছে তা যেন না কমে।আমি বাবার সেই কথার উপর অবিচল থেকে চলতে চেষ্টা করেছি এবং আশা করি বাবার সম্মান একটুও কমেনি বরং বেড়েছে।
১৭। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর জানতে পারলাম দেশের সবথেকে বড় ঈদের নামাজ হয় কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়াতে। বাবাকে বললাম বাবা আমি ওখানে নামাজ পড়বো!! বাবা সাথে সাথে রাজি হয়ে গেলেন।সাধ্যের মধ্যে সব ইচ্ছে পুরনে বাবা আমাকে সহযোগিতা করেছেন।
১৮। আমার বাবা টিচার। বেতন কত পান জানি না তবে তিনি আমাদের ভাই বোন সবাইকে উচ্চশিক্ষার জন্য সচেষ্ট ছিলেন এমনকি আমার এক ভাইকে দেশের সবথেকে ব্যয়বহুল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়াতেও পিছপা হননি। তিনি বলেছিলেন সব সম্পদ বিক্রি করে হলেও পড়াবো। বাবা কখনো সাহস হারা হননি।
১৯। আমার বাবা ম্যানার জানেন। আমার একই ব্যাংক একাউন্টের তিনটা কার্ড (অ্যামেক্স,মাস্টার,ভিসা) যার একটা ডেবিট কার্ড বাবার কাছে আছে। বাবা ম্যানার জানেন বলেই যখন টাকা ওঠান তখন আমাকে বলেন আমি টাকা তুলছি! অথচ না বললেও কোন অসুবিধা ছিলো না কারণ বাবাকে বলে রেখেছি যখন খুশি তুমি টাকা তুলে নিতে পারো।

আমার বাবা উচ্চশিক্ষিত এবং জীবনে কোন দিন দেখিনি নিরক্ষর,নিম্নআয়ের মানুষ,ফকির.মিসকিন বা অন্য কোন মানুষকে তিনি অবহেলা,অবজ্ঞা করেছেন। বরং সবাইকে তিনি সম্মান দেখিয়েছেন এবং পারত পক্ষে সাহায্য করেছেন এবং এখনো করেন।
২০। আমার বাবা ছবি তুলতে পছন্দ করেন। ক্যামেরা হাতে বিভিন্ন সময় ছবি তুলে ফেসবুকে শেয়ার করেন এবং বাবার ছবিতে তিন থেকে পাঁচশোর অধিক লাইক পড়ে। অনেক মন্তব্যও পড়ে। আমি মুগ্ধ হই। বাবার ছুটির অবসরে বাইক নিয়ে দূর দূরান্তে ঘুরতে বেরিয়ে পড়েন। রাতে ফিরতে দেরি হলে মা মাঝে মাঝে রাগ করেন।
২১। বাবার কোন কিছু পছন্দ না হলে সেটা বলতে দ্বিধা করেন না। কিছুদিন আগে একটা মোবাইল কিনে দিলাম বাবার পছন্দ হলো না । বাবা বললেন আমার স্যামসাং চাই এবং নির্দিষ্ট মডেল চাই। আমি শেষে বাবাকে তার পছন্দমতই কিনে দিলাম। কারণ আমার বাবা সারা জীবন আমাকে আমার পছন্দের সব কিনে দিয়েছেন।

আমার বাবা অলরাউন্ডার। তিনি চিকিৎসা বিষয়ে জানতে খুব আগ্রহী,নিত্য নতুন বিষয়ে জানতে আগ্রহী,ফটোগ্রাফিতে আগ্রহী,বই পড়তে ভালোবাসেন,ঘুরতে ভালোবাসেন। আর নানাবিধ ক্রিয়েটিভ বিষয় তাকে আনন্দ দেয়। আমি আমার বাবার কাছ থেকে তার গুনগুলো পেয়েছি। বাবাকে এলাকার মানুষ খুব সম্মান করে আর ছোটরা ভয়ও পায়। আমিও ভয় পাই,এখনো পাই। বাবার সামনে গলা উচু করে কথা বলি না যদিও জানি বাবা কিছুই বলবেন না বরং নানা বিষয়ে আমার মতামতকে বেশ গুরুত্ব দিয়ে থাকেন।

আমি আমার বাবাকে নিয়ে সামান্যই লিখেছি। আমি আমার বাবাকে ভালোবাসি। বাবাও আমাকে ভালোবাসেন। বাবা দিবস বলেই নয় বরং আমি সব সময় বাবাকে একই রকম ভালোবাসি। আমি নামাজ শেষে প্রার্থনা করি হে আল্লাহ আমার জীবনের সমস্ত হায়াত নিয়ে হলেও আমার পিতা মাতাকে দীর্ঘায়ূ দান করুন সুস্থ্যতা দান করুন। আল্লাহর শিখিয়ে দেওয়া প্রার্থনার বাইরে এটা আমার নিজের মত করে করা প্রার্থনা। আমি চাই আমার বাবা মা দুজনই সুস্থ্য থাকুক আরও অন্তত চল্লিশ বছর বেঁচে থাকুক সুস্থ্য ভাবে। আল্লাহর কাছে আমার প্রথম এবং সব চেয়ে গভীর প্রার্থনা আমার পিতা মাতার সুস্থ্য সুন্দর দীর্ঘ জীবন কামনা। আল্লাহ যেন আমার যে কোন ভালো কাজের বিনিময়ে হলেও আমার বাবা মাকে সুস্থ্য রাখেন দীর্ঘ জীবন দান করেন। পৃথিবীর সব বাবা মাকে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।

–জাজাফী
২১ জুন ২০২০