মূল সমস্যার বেশির ভাগ আমাদের আগের জেনারেশন এর মধ্যে

মূল সমস্যার বেশির ভাগ আমাদের আগের জেনারেশন এর মধ্যে।
তারও আগের জেনারেশন যুদ্ধ করেছে এবং তারা অনেক সাহসী ও সচেতন ছিল বলেই আমরা একটি স্বাধীন দেশ,স্বাধীন পতাকা পেয়েছি,রাষ্ট্র ভাষা হিসেবে বাংলাকে পেয়েছি। কিন্তু আফসোস তার পরের জেনারেশন সেই পথে হাটতে পারেনি,পুর্বসুরীদের অনুসরণ করতে পারেনি এবং সব কিছু টেকেন ফ্রর গ্র্যান্টেড নিয়েছে সেই সাথে আমাদের জেনারেশন এর মধ্যে যারা এগুতে চায় বা পদক্ষেপ নিতে চায় তাদেরকে পেছন থেকে টেনে ধরেছে। আমাদের যুব সমাজ সচেতন ছিলো এবং আছে। তবে আমাদের মা বাবারা ভালোবাসার নাম করে সমস্যা তৈরি করে রেখেছে যা কেউ কখনো উপলব্ধিও করতে পারেনি।

আমরা সাম্প্রতিক কালের এক বা একাধিক ইস্যু নিয়ে চিন্তা করলেই বিষয়টি পরিস্কার বুঝতে পারি। বুয়েটে যে আবরার ছেলেটি মারা গেলো বা তাকে মেরে ফেলা হলো সে নিশ্চই তখন চিৎকার করেছিল এবং তার চিৎকার নিশ্চই আসেপাশে অনেকেই শুনেছিল। যারা তাকে আক্রমন করেছিল তার চেয়ে অনেক বেশি ছিলো অনাক্রমনকারী যারা সম্মিলিত ভাবে চাইলেই এটিকে প্রতিহত করতে পারতো। কিন্তু তা ঘটেনি।খোঁজ নিয়ে দেখুন এই ইস্যু হবার পর বুয়েটিয়ানদের বাবা মা ফোন করে তাদের সন্তানদের বলেছে এ বিষযে কথা বলবি না,পোস্ট দিবি না,তাহলে ওরা তোর পিছনেও লাগবে!

গণজাগরণ মঞ্চের সেই উত্তাল দিনের কথা নিশ্চই মনে আছে।যাদের আওয়াজ পৌছে গিয়েছিলো সারা বিশ্বে।আর সে কারণেই বছরের পর বছর শক্তিশালী সরকার ক্ষমতায় আসার পরও যা করতে পারেনি গণজাগরণ মঞ্চ তৈরি হওয়ার কল্যাণে তা সম্ভব হয়েছে। সম্মিলিত প্রয়াসই যে কোন কিছুকে পেতে সহযোগিতা করে।

ক্রিকেট বা ফুটবল খেলায় বা অন্য যে কোন খেলায় শুধু খেলোয়াড়দেরই অবদান থাকে না বরং অনেক সময় দর্শকের কল্যাণে দুর্বল দলও সবল হয় সাহস পেয়ে। আমরা ভালো কোন কাজে ঐক্যবদ্ধ হতে পারিনা বরং আমরা যে কোন ইস্যুতে একাধিক দলে বিভক্ত হয়ে পড়ি ।হয়তো অনেকেই আমরা জানি বিষয়টি সত্যি তার পরও আমরা পাশকাটিয়ে সেটিকে নিজেদের বিপরীত বলে প্রতিহত করতে চেষ্টা করি।

একজন মানুষ অক্সিজেনের অভাবে মারা যাচ্ছে জানার পর আমার কাছে থাকা অক্সিজেন সুলভ মুল্যে তাকে না দিয়ে বরং তাকে আরও কঠিন পরিস্থিতিতে ঠেলে দিচ্ছি। ৫ টাকার মাস্ক আমরা ২৫ টাকায় বিক্রি করছি।

এই যে করোনাকালীন দুর্যোগে গোটা বিশ্ব থমকে গিয়েছে তার পরও দেখুন কোথাও কোথাও সীমান্তে গোলাগুলি হচ্ছে,নারী ও শিশু নিয়মিত নির্যাতিত হচ্ছে,খুন হচ্ছে,ধর্ষিত হচ্ছে। সামান্য দুদিনের জীবন সব রেখে যাবো এবং ফিরে যাবো খালি হাতে তার পরও আমাদের লোভ কমছে না! আর এসবের জন্য বাবা মাকেই বরং বেশি সচেতন হতে হবে। আপনি আপনার সন্তানকে কিভাবে মানুষ করবেন,কিভাবে পরিচালনা করবেন,কি স্বপ্ন দেখাবেন তার উপর ভবিষ্যতের বাংলাদেশ নির্ভর করছে। আপনি আচলেঁর তলে বেঁধে রাখবেন এবং আপনি হয়তো চাইছেন আপনার সন্তানের ভালো হোক আদতেই কি তাই হচ্ছে? আপনার সন্তানকে সামলে রাখলেই সব ঠিক হবে না বরং এমন কিছু শিক্ষা দিতে হবে যেন তা অন্যের কাজে লাগে। রাস্তায় যেতে যেতে আপনার সন্তান যখন দেখবে কেউ বিপদগ্রস্থ হয়েছে সে ছুটে যাবে তাকে সাহায্য করতে। সাহায্য করতে গিয়ে তার প্রাণও চলে যেতে পারে কিন্তু আপনি যদি তাকে নিষেধের বেড়াজালে আটকে রাখেন তবে একদিন সে নিজেও বিপদে পড়তে পারে তখন অন্যরাও আপনার সন্তান যেমন এগিয়ে যায়নি তেমনি আপনার সন্তানের বিপদে এগিয়ে আসবে না।

পরিবর্তন আসে পরিবার এবং বাবা মায়ের হাত ধরে। যদি মুক্তি যোদ্ধাদের বাবা মায়ের মত বলতেন যা বাবা দিলাম তোকে দেশের নামে কোরবানী করে। তাহলে আবরারের মত অনেককেই মরতেই হতো না। আমাদের জেনারেশন এর মধ্যে অনেক সম্ভাবনা আছে,স্বপ্নও আছে কিন্তু সেই স্বপ্নগুলো পরিবার থেকে কেবল মাত্র নিজেদের কথা ভেবে নষ্ট করে দেওয়া হচ্ছে। অফিস থেকে তার কর্মীদের বলে দেওয়া হচ্ছে অন্যায়ের প্রতিবাদ করা যাবে না,স্ট্যাটাস দেওয়া যাবে না। বাবা মা সন্তানকে বলে দিচ্ছে স্ট্যাটাস দিও না,কোন কথা বলো না। চোখের সামনে কেউ চুরি করবে আর আপনি আপনার সন্তানকে বলবেন তুমি চোখ বন্ধ রাখো,কান বন্ধ রাখো,মূখ বন্ধ রাখো।

একবার ভেবে দেখুনতো বঙ্গবন্ধুর মা বাবা যদি তাঁকে বলতেন বাবা তুই কেন প্রতিবাদ করছিস? ঘরে থাক তাহলে কি হতো? আজকের এই সুন্দর স্বাধীন দেশ আমরা কি পেতে পারতাম? একজন চুরি করে,অন্যায় করে আর একশোজন সেটা নিরবে সহ্য করে,দেখে কিন্তু কথা বলে না ফলে আরও এক হাজার জনের ভাগ্যের নির্মম পরিহাস সহ্য করতে হয়।

পৃথিবীতে ৭৭৮ কোটি মানুষের মধ্যে হাতে গোনা ১ কোটি মানুষের কারণে বাকিদের নানা ভাবে ভোগান্তিতে পড়তে হয়। একজন ট্রাফিক পুলিশ যখন সামান্য ১০০ টাকার জন্য লাইসেন্স বিহীন বা মেয়াদউত্তীর্ণ লাইসেন্স সহ ড্রাইভারকে ছেড়ে দেয় তখন তা কত বড় বিপদ ডেকে আনে ভাবতে পারেন? যেতে যেতে সে কাউকে মেরে ফেলতে পারে তখন সেই মৃত মানুষটির জীবন ওই ট্রাফিক পুলিশ বিক্রি করেছে ১০০ টাকার বিনিময়ে।

একজন ডাক্তার,নার্স,শিক্ষক,ব্যাংকার,ফায়ার কর্মী সবারই সঠিক দায়িত্ব পালন করতে হয়। শিক্ষক একজনকে নকলের সুযোগ করে দিলো,ব্যাংকার লোন পাইয়ে দিলো,ডাক্তার সেবা দিতে গড়িমসি করলো,ফায়ার কর্মী অবহেলা করে দেরিতে পৌছালো সব কিছুতেই বিরাট ক্ষতি তৈরি হয়। আমাদের বাবা মায়েরা সন্তানদের ছোটবেলা থেকেই যদি মানবতার কথা শেখায়,মানুষের পাশে দাড়ানোর কথা শেখায় যদি বলতে পারে না খেয়ে থাকবি তবু চুরি করবি না। মরে যাবি তবু মিথ্যা বলবি না,ঘুষ নিবি নি,অন্যকে অপমান করবি না,ইভ টিজিং করবি না,সদা সত্যের পথে অবিচল থাকবি এবং অন্যায় দেখলে প্রতিবাদ করবি তবেই একটি সুন্দর আগামীর স্বপ্ন সত্যি হবে। সোনার বাংলা গড়তে হলে এর কোন বিকল্প নেই।

তার পরও কিন্তু আন্দোলন হয় আবার থেমে যায়। পলিথিন ক্ষতিকর জেনে সরকারী ভাবে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছিল কিন্তু এখনো দেদারছে পলিথিন বিক্রি হচ্ছে! মূলত আগের জেনারেশন যারা মুক্তিযুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়েছিল,ভাষা আন্দোলনে যুক্ত ছিলো তাদের ছায়ায় বড় হয়ে কিছুটা সচেতন ছিলো আর বাকিরা তাদের ফটোকপি হয়েছে।

বড় বড় শপথ নিয়ে দেশ বদলানো যাবে না,দেশ উন্নত করা যাবে না বরং খুব ছোট্ট একটি সিদ্ধান্তই সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার জন্য যথেষ্ট। আপনি এই মুহুর্তে যে কাজটি করছেন তা কি ঠিক হচ্ছে কি না ভেবে করুন। কোন ফাইল আটকে দিলে ভালো আর কোনটা ছেড়ে দিলে ভালো তা বুঝতে হবে। সন্তানকে কখন চুপ থাকতে বলতে হবে আর কখন আওয়াজ তুলতে উৎসাহ দিতে হবে তা বুঝতে হবে।

কথা বলার স্বাধীনতার নামে যা খুশি যেমন বলা যাবে না তেমনি কেউ সত্যি বলতে চাইলে তাকে সেই সুযোগটা দিতে হবে। আইন করে,সন্তানের মুখ বন্ধ রেখে আর যাই হোক সমৃদ্ধ আগামী কল্পনাও করা যায় না। এ জন্য চাই একটি সম্মিলিত প্রয়াস। পৃথিবীতে কেউ আজীবন টিকে থাকবে না। চিন্তা করে দেখুন কবে কোন দেশের জন্য চেগুয়েভারা কী করেছেন তার জন্য এই দেশেও আমরা কত ভালোবাসা জমা করে রেখেছি,স্মরণ করছি আর আমি আপনি এই দেশে জন্ম নিয়ে জীবন পার করে দিয়ে এমন কিছুই করিনি যার দরুন এই দেশের মানুষই আমার কথা মনে রাখে না।

–জাজাফী
২০ জুন ২০২০