সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহীতা অপরিহার্য

গোটা পৃথিবী এখন ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে।এই সময়ে অসংখ্য মানুষ যেমন ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে আবার হাতেগোনা কিছু মানুষ সম্পদে ফুলে ফেপে উঠছে।বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল দেশ যা ক্রমাগত ভাবে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হচ্ছে। কাগজে কলমে হয়তো মাথাপিছু আয় দেখলে আমরা বলতেই পারি যে আমরা মধ্যম আয়ের দেশে উত্তীর্ণ হয়েছি কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। বর্তমান সরকার তার দীর্ঘ মেয়াদে সরকার পরিচালনার কারণে তুলনামূলক ভাবে উন্নয়ন প্রকল্পগুলো খুব সহজেই চোখে পড়ছে।

দেশের ইতিহাসের সব থেকে বড় বড় প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নাধিন আছে যা দেশের উন্নয়নের মডেল হিসেবে উপস্থাপন করা যেতে পারে।কিন্তু বিগত সময়ে যত বড় বড় প্রকল্প আমরা বাস্তবায়ন করেছি বা করতে চেয়েছি প্রতিটির বিষয়েই নানা মহলে কথা উঠেছে,সমালোচনা হয়েছে কিন্তু তার পরও সেই সব প্রকল্প ঠিকই বাস্তবায়ন হয়েছে। এ থেকে বোঝা যায় যে সমালোচনা করে আদতে তেমন কোন লাভ হয় না বরং যার হাতে টিভির রিমোর্ট চ্যানেল সে তার ইচ্ছেমতই ঘুরাবে।এতে করে আশানুরুপ ফল পাওয়া সম্ভব হয় না।

আমরা জানি আমাদের অর্জনের তালিকা দিন দিন দীর্ঘ হচ্ছে এবং গর্ব করে বলার মত সেগুলো আমরা সবাইকে দেখাতে পারছি। স্বাধীনতার অনেক বছর পর আমরা যখন সফল ভাবে নিজস্ব স্যাটেলাইট উৎক্ষেপন করতে সক্ষম হয়েছি সেই প্রকল্প নিয়েও নানা মহলে অনেক আলোচনা সমালোচনার জন্ম নিয়েছে। লক্ষ্য করলে দেখা যায় প্রতিটি প্রকল্প নিয়েই কিছু না কিছু সমালোচনা হয়েছে তবে কোনটিকেই তেমন গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।

উন্নত বাংলাদেশ গড়তে হলে সবাইকে সম্মিলিত ভাবে কাজ করতে হবে।প্রথমত আমরা দেখতে পাই সরকার কোন একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গেলে জনসাধারণতো দূরের কথা বিরধী দল এবং অন্যান্য জ্ঞানীজনরাও সেটি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল থাকেন না যতক্ষণ না সেটা মন্ত্রিপরিষদ থেকে অনুমোদন পেয়ে বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয় এবং পত্রিকায় সেটি নিয়ে সংবাদ প্রচার করা হয়। যখনই এটা হয় তখন আমরা দেখতে পাই অবধারিত ভাবেই বিরোধী রাজনৈতিক দল এবং তার সমর্থকেরা এটির ঢলাও ভাবে বিরোধীতা করে। উক্ত প্রকল্প গুরুত্বপুর্ন এবং উন্নয়নবান্ধব হলেও বিরোধীতা করা হয় আবার না হলেও বিরোধীতা করা হয়। এর ফলে মূলত যে কোন ধরনের উন্নয়ন বাধাগ্রস্থ হয়। স্বাধীন দেশের একজন নাগরিক হিসেবে এবং বাস্তবজ্ঞান সম্পন্ন ব্যক্তি হিসেবে আমি এই ধারার সাথে কোন ভাবেই একমত নই। সরকারের প্রতি আমার এ বিষয়ে একটি প্রস্তাবনা রয়েছে।

আমি চাই আজ থেকে যখন যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক না কেন যে কোন প্রকল্প শুরু করার আগে সেই প্রকল্প সম্পর্কে দেশবাসীকে বিস্তারিত লিখিত আকারে বিবৃতি দিয়ে জানাবে। যেখানে লেখা থাকবে প্রকল্পটি কি,কোথায় বাস্তবায়ন করা হবে,কত খরচ হবে,ব্যয় কিভাবে কোন খাতে কত যাবে,ব্যয় কিভাবে বহন করা হবে, এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করলে দেশ এবং জনগনের কি কি উপকার হবে। এটি করতে গিয়ে সামাজিক,আর্থিক এবং পরিবেশগত কোন ক্ষতি হবে কি না। যদি ক্ষতি হয়ে থাকে তবে সেটির পরিমান কত এবং তা কাটিয়ে উঠতে কি কি পদক্ষেপ নেওয়া হবে। প্রতিটি প্রকল্প অনুমোদনের আগে এই সব বিষয় তুলে ধরতে হবে।

যা দেখার পর বিরোধীদল এবং দেশের অন্যান্য বুদ্ধিজীবীরা তাদের মতামত দিবে। সেই মতামতকে অবশ্যই বিবেচনায় নিতে হবে। তা বলে শুধু বিরোধীতা করে মতামত দিলেই চলবে না বরং সরকার যেমন তাদের প্রকল্প সম্পর্কে বিস্তারিত জানাবে একই ভাবে কেউ বিরোধীতা করতে চাইলে তাদের স্বপক্ষে যুক্তি উত্থাপন করতে হবে। উভয় যুক্তি পর্যালোচনা করার মাধ্যমে উক্ত প্রকল্প অনুমোদন হবে নতুবা বাতিল হবে। আর এটা করতে পারলে তবেই একটি উন্নত,সমৃদ্ধ বাংলাদেশ আমরা পেতে পারি।

পদ্মাসেতু,মেট্রোরেল,রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে এবং নদীর নিচ দিয়ে টানেল নির্মান বিষয়ে সরকার একতরফা ভাবে যেমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে তেমনি বিরোধীদল একতরফা ভাবে সমালোচনা করেছে,বিরোধীতা করেছে যার কোনটাই সমর্থনযোগ্য নয়। বিরোধী দল বিরোধীতা করতেই পারে তবে তার স্বপক্ষে যুক্তি উত্থাপন করা উচিত এবং সরকারের উচিৎ সেই যুক্তিগুলো বিবেচনা করা এবং খন্ডন করা।

যেহেতু প্রকল্পগুলো অনুমোদন পেয়ে অনেক কাজ এগিয়ে গিয়েছে তাই ওই প্রকল্পগুলোর সার্বিক সাফল্য কামনা করি এবং যারা সমালোচনা করেই ক্ষান্ত হচ্ছে তাদেরকে বলতে চাই আপনারা বাস্তবায়নাধিন প্রকল্পগুলোর সমস্যাগুলো তুলে ধরুন এবং সমাধানের পথ বাতলে দিন যেন ওগুলো আরও ভালোভাবে বাস্তবায়িত হতে পারে এবং সরকারের উচিত সেই সব সুলিখিত প্রস্তাবনাগুলো সাদরে গ্রহণ করা। সেই সাথে পরবর্তীতে যত ছোট বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত হবে তা উপরে বর্ণিত পদ্ধতি অবলম্বন করতে পারলে আমরা আশানুরুপ সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে পারবো বলে বিশ্বাস করি।

শুধুমাত্র প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেই বিষয়টি থেমে থাকলে চলবে না বরং যে কোন রিকম নিয়োগে এবং নির্বাচনের ক্ষেত্রেও এই পদ্ধতি অবলম্বন করা জরুরী। ক্রিকেট দলে কে কে খেলবে তা সাধারণত নির্বাচকমণ্ডলী নির্ধারণ করে থাকেন সে ক্ষেত্রে নির্বাচকমণ্ডলীর বাইরেও যারা অভিজ্ঞ এবং গুরুত্বপুর্ন মতামত দিতে পারতো তাদের সেই সুযোগ থাকছে না। নির্বাচকমণ্ডলীর উচিৎ তাদের নির্বাচিত খেলোয়াড়দের একটি তালিকা প্রণয়ন করা এবং সেই তালিকা দেখে দেশের অন্যান্য অভিজ্ঞরা সে বিষয়ে মতামত দিবে।

সেক্ষেত্রে দল আরও শক্তিশালী হবে বলে মনে করি।একই ভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ থেকে শুরু করে নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী মনোনয়ন সহ অন্যান্য নিয়োগের ক্ষেত্রে একই পদ্ধতি অবলম্বন করতে পারলে এমন কিছু মানুষকে আমরা নির্দিষ্ট দায়িত্বে দেখতে পাবো যারা আমাদের জন্য একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ এনে দিতে পারবে। বর্তমানে যারা বিভিন্ন ক্ষেত্রে দায়িত্ব পালন করছে তারা যে যোগ্য নয় এমনটি নয় কিন্তু জবাবদিহীতার ভিত্তিতে নির্বাচন করতে পারলে তা আরও ফলপ্রসু হতে পারে।

আমরা জানি প্রকল্পগুলি জনসাধারণের সামনে উত্থাপন করতে পারলে বর্তমান সময়ে যে সব আন্দোলন হয়ে থাকে তার আর প্রয়োজন হবে না। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের ভিতর মেট্রোরেল করার প্রতিবাদে শিক্ষার্থীরা যে প্রতিবাদ করছে তা যেমন যৌক্তিক তেমনি মেট্রোরেল করার সিদ্ধান্তটাও কোন ভাবে ফেলে দেওয়ার মত নয়। প্রকল্প বাস্তবায়নের মাঝপথে তা থেকে যেমন সরে আসার উপায় নেই তেমনি শিক্ষার্থীদের দাবীও অবহেলার উপায় নেই। অথচ এই সব বিষয় বাস্তবায়ন এবং অনুমোদনের আগেই জনসম্মুখে আনতে পারলে যে কোন রকম অনাহুত পরিস্থিতি থেকে দেশ এবং সমাজ বেচে থাকতে পারে যা প্রকারান্তে একটি উন্নত রাষ্ট্র গঠনে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহীতা অপরিহার্য এই কথাটিকে হৃদয়ে ধারণ করে ভবিষ্যতের কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা উচিৎ।


২১ জুন ২০২০
জাজাফী
আহ্বায়ক
“আমরা আনিবো রাঙা প্রভাত”