রহস্যময় বিশ সাল

বিশ সাল যেন ঘন্টাওয়ালা ঘড়ির কাটার মত,ঘুরতে ঘুরতে বারটার ঘরে আসতেই টং করে বেজে ওঠে। কিংবা হ্যালির ধুমকেতুর মত যে কিনা নির্দিষ্ট সময় পর পর উদয় হয়। ইতিহাসের পাতা থেকে জানা যায় প্রতি শতাব্দীর বিশ সাল বিষে ভরপুর।পৃথিবীতে যত বড় বড় দুযোর্গ হানা দিয়েছে তা কেন যেন বিশ সালকেই বেছে নিয়েছে।যেন সেই অলিখিত নিয়মের মত বিশ্বে যত বিশ্বসুন্দরীই আসুকনা কেন মেরিলিন মনরোই সেরা।

বিশ্বে সারা বছরই কোন না কোন সমস্যা থাকে যার কোনটা বড়ে কোনটা ছোট। তবে তা নির্দিষ্ট কোন একটি সীমারেখা দ্বারা বেধেঁ রাখার মত। কিন্তু প্রতি শতাব্দির বিশ সাল এমন দুর্যোগপুর্ন যে তা কোন নির্দিষ্ট সীমা রেখায় বেধেঁ রাখা সম্ভব হয়নি। এমন সব অজানা শত্রু হানা দিয়েছে যে তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার মত কৌশল এবং অস্ত্র পৃথিবীর হাতে নেই। এলাম, দেখলাম, জয় করলাম, কথাটার মতই মানুষ যখন এই যুদ্ধ জয়ের কৌশল আবিস্কার করে উঠবে ততোদিনে সেই অজানা শত্রু গোটা পৃথিবীকে ধুসর মরুভূমি করে দিয়ে গেছে। বিগত তিনশো বছরের ইতিহাস তাই বলে। এবং সেই ধারাবাহিকতা অব্যহত রেখে ২০২০ সালও একই রূপে আবির্ভূত হয়েছে করোনা ভাইরাস। এ যেন তার জ্ঞাতি ভাই যেটা করতে পারেনি সে সেটা করে দেখানোর পণ করে পৃথিবীতে আর্বিভূত হয়েছে।

অনুসন্ধানীরা দেখিয়েছেন গত ৩ শ বছরের প্রতি শতকের ২০ সালে বিশ্বব্যাপী এমন মহামারি দেখা দিয়েছে, যার ফলে অসংখ্য মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। পাশাপাশি প্রতি শতকের ২০ সালে প্রাদুর্ভাব হওয়া ভাইরাসের সঙ্গে চলতি ২০২০ সালের করোনাভাইরাসের মিল রয়েছে।

ঘটনাচক্র শুরু হয়েছিল ১৭২০ সালে ইউরোপ থেকে। সেখানে হানা দিয়েছিল এক প্রাণঘাতি ভাইরাস,বিজ্ঞানীরা যার নাম দিয়েছিল “গ্রেট প্লেগ অব মার্সেইলি”। এ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ১৭২০ সাল থেকে ১৭২২ সালে সেখানে ১ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়। শুধু ফ্রান্সের মার্সেইলি শহরে মারা যায় ৫০ হাজারের বেশি মানুষ। যার ফলে দেশটির জন্মহার ৪৫ বছরের জন্য কমে যায়।

তখন কেউ জানতো না যে আরও একটি নতুন শতাব্দীর বিশ সাল আবার এক ভয়াবহ আতঙ্ক নিয়ে পৃথিবীতে আগমন করবে। ১৮২০ সালে কলেরার প্রাদুর্ভাব দেখা দেয় যা সারা পৃথিবীতে অতি মহামারি আকার ধারণ করে । এর প্রাদুর্ভাব ১৮২৪ সাল পর্যন্ত প্রভাব বিস্তার করে। তবে ১৮২০ সালেই সবচেয়ে বেশি ধ্বংসযজ্ঞ চালায় এ রোগ। ওই বছর ভারতসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আক্রান্ত এলাকাগুলোর দৃশ্য ছিল খুবই ভয়াবহ।এশিয়াটিক কলেরা নামে পরিচিত এই মহামারিতে বিশ্বব্যাপী ঠিক কত মানুষ মারা গিয়েছিল তা জানা যায়নি। তবে পরিসংখ্যান অনুসারে, শুধু ব্যাংককেই মারা গিয়েছিল প্রায় ৩০ হাজার।পৃথিবীতে সারা বছরই কোন না কোন ভাইরাসের প্রভাব থাকে তবে তা খুব সামান্য এবং সেটাও অঞ্চল ভেদে। কিন্তু প্রতি একশো বছর পর পর যেটা আসছে তা বিশ্বব্যাপী প্রভাব বিস্তার করছে। ১৮২০ সালের পর আরও একশো বছর অপেক্ষা এবং নিয়মের কোন রকম হেরফের না করে ১৯২০ সালে কানসাসের মার্কিন সেনাদের মধ্যে প্রথম দেখা দেয় স্প্যানিস ফ্লু নামের ইনফ্লুয়েঞ্জা জ্বর। পরে তা ঝড়ের গতিতে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। দুই বছরে পৃথিব্যাপী এই জ্বরে আক্রান্ত হয়ে মারা যায় কমপক্ষে ৫ কোটি মানুষ।

আবার একশো বছরের বিরতী দিয়ে ২০২০ সালে চীনের হুবেই প্রদেশের উহান শহর থেকে ছড়িয়ে পড়ে প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসে (কোভিড-১৯)। যার মরণ ছোবলে জর্জরিত সারাবিশ্ব। বিভিন্ন দেশে ভাইরাস আতঙ্কে কোয়ারেন্টাইনে আছেন কয়েক কোটি। দেশে দেশে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে ধর্মীয় উপসনালয় ও গণ পরিবহন। তবে সবচেয়ে আতঙ্কের বিষয় হচ্ছে, এখন পর্যন্ত এ ভাইরাস থেকে মুক্তির কোনো প্রতিষেধক আবিষ্কার করতে পারেনি বিজ্ঞানীরা। এখন অব্দি গোটা বিশ্বে মারা গেছে প্রায় পৌনে চার লাখ মানুষ।