করোনায় বিপযস্থ কর্মজীবী মায়েরা

করোনা ভাইরাস পৃথিবীতে এমন ভাবে বিস্তার করেছে যে নিজ ঘরেও কেউ আজ আর নিরাপদ নয়। নানা ভাবে দিন দিন সংক্রমন বেড়েই চলেছে।এর মধ্যে যে সব নারী একই সাথে কর্মজীবী এবং সন্তানের মা তারা ভীষন ঝুকির মধ্যে আছেন। শুধু মাত্র ঝুকিই নয় বরং আতংকিত থাকতে হচ্ছে সারাক্ষণ।সন্তান এবং পরিবারের সর্বাঙ্গীন কল্যান কামনা কারী মানুষটি পরিবারকে ভালো রাখতে ঝুকিপুর্ন দিনে ঝুকি নিয়ে কর্মস্থলে যাচ্ছেন। ফলে কর্মজীবী মায়েদের সারাক্ষণ তটস্থ থাকতে হচ্ছে। ভোরে অফিসের উদ্দেশ্যে বের হওয়ার পর থেকে ফেরা অব্দি কত শত মানুষের সংস্পর্শে তাকে আসতে হয়। তিনি জানতেও পারেন না কোন মানুষটি ভাইরাসের বাহক হিসেবে তার সামনে,পিছনে বা পাশ দিয়ে যাওয়া আসা করছে আর সেই ভাইরাসের একাংশ নিজের অজান্তে ঘরে নিয়ে গিয়ে ঘরে থাকা সন্তানদের এবং অন্যান্যদের বিপদের মুখে ঠেলে দিচ্ছেন।

সাম্প্রতিক একটি অনুষ্ঠানে এক নারী শিল্পী গান করছিলেন, এর মাঝেই তার তিন-চার বছরের মেয়েটি তাকে জড়িয়ে ধরে আছে এমন একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। এ ছবিটি একজন কর্মজীবী মায়ের ছবি।কিছুদিন পুর্বে আরেকটি ছবিতে দেখা যায় ভারতের এক নারী ব্যাংক কর্মকর্তা অফিসের চেয়ার-টেবিলে বসে কাজ করছেন পেছনে মেঝেতে দুধের বোতলমুখে শুয়ে আছে তার ছোট্ট জ্বরে আক্রান্ত শিশু সন্তানটি। এটিও একজন কমর্জীবী মায়েরই ছবি।


সন্তান পালনে বাবাদের ভূমিকা অর্থ উপার্জন আর কখনও কখনও পড়া বুঝিয়ে দেওয়ার মধ্যেই সীমিত।সবকিছু সমান ভাবে সামলাতে হয় মা কে। কিন্তু সেই মা যদি হন কর্মজীবী তাহলে সমস্যার অন্ত থাকে না।এছাড়াও কর্মজীবী নারীদের এক বিরাট অংশ সিংগেল মাদার হিসেবে সন্তানকে লালন পালন করতে বাধ্য হয়েই কর্মক্ষেত্রে থাকতে হচ্ছে।সন্তানকে খাওয়ানো,গোসল করানো,স্কুলে পাঠানো,স্কুল থেকে নিয়ে আসা সব সামলাতে হয় পাশাপাশি অফিসও করতে হয়। করোনার এই দিনে সেটা হয়ে উঠেছে আরও ভয়াবহ। যদিও স্কুল বন্ধ তাই সন্তানকে স্কুলে পাঠানো এবং নিয়ে আসার বিষয়টি থাকছে না কিন্তু তিনি নিজে সন্তানকে ফেলে রেখে অফিসে যাচ্ছেন এক রকম অনিশ্চয়তার মধ্যে। আবার ফিরছেন ভয় আর শঙ্কা নিয়ে। অন্য দিকে স্কুলগুলোতে অনলাইন ক্লাস হওয়ায় সেগুলো তদারকিতে কর্মজীবী মা সন্তানকে সময় দিতে পারছেন না ফলে সন্তানের পড়াশোনা ব্যহত হচ্ছে।

জ্যামের শহরে ভীড় ঠেলে,গাদাগাদি করে বাসে সিট না পেয়ে দাড়িয়ে রোজ অফিস করা এবং অফিস শেষে সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে পোহাতে বাসায় ফেরা তার নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার।কী এক দিন এলো অফিস ফেরৎ মা তার সন্তানকে বুকে জড়িয়ে নিতে পারছেন না যতক্ষণ না তিনি নিজে গোসল করে পরিচ্ছন্ন না হচ্ছেন।নিজের চেয়েও মায়ের কাছে সন্তানের নিরাপত্তার বিষয়টি বেশি গুরুত্বপুর্ন।

আমাদের কর্মপ্রতিষ্ঠানগুলোতে এখনও নারীর মেধা আর পরিশ্রমের মূল্যায়ন করা হয় কদাচিৎ। উপরন্তু সন্তানের অসুস্থতার কারণে কাজে ছুটি চাইলে কমর্জীবী মায়েদেরকে অহরহ কটূ কথা আর টিপ্পনি শুনতে হয় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা আর পুরুষ সহকর্মীদের কাছে।

করোনা ভাইরাসের এই ঝুকিপুর্ন অবস্থায় একজন পুরুষ সারাদিন অফিস করে বাসায় ফিরে চাইলে একাকী থাকতে পারেন কিন্তু কর্মজীবী নারী যিনি কারো মা,কারো স্ত্রী তার কোন ভাবেই একা থাকা সম্ভব নয়। স্বামী,সন্তান সবার দায়িত্ব এ সমাজ একক ভাবে তার কাঁধেই চাপিয়ে দিয়েছে।সন্তানের প্রতি মায়ের মমতা অতুলনীয়। তিনি চাইলেই এমন দুর্যোগের সময়েও সন্তানকে দূরে ঠেলে দিতে পারেন না ফলে কর্মজীবী মায়েদের জন্য করোনাকাল হয়ে উঠেছে বিষে ভরা কাটার সমতুল্য যা তাকে বার বার ক্ষতবিক্ষত করছে। মাতৃত্বকালীন ছুটি বলে যে বিষয়টি চালু আছে এই দুযোর্গকালীন সময়ে একই ভাবে কর্মজীবী মায়েদের সন্তানের কথা বিবেচনা করে বিপদকালীন ছুটির ব্যবস্থা রাখা উচিত ছিলো।

নিজের পায়ে দাড়ানোর স্বপ্ন নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ চুকিয়ে সমাজের নানা কথা শুনতে শুনতে যে নারী কর্মজীবনে প্রবেশ করে তাকেও নানা কারনে পঁচিশেই বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হয়। তার পর নতুন সংসার আর চাকরি নিয়ে হিমশিম খেতে খেতেই সে হয়তো অনাগত সন্তানের আগমনী বার্তা শোনে বছর না ঘুরতেই। পান থেকে চুন খসলেই সব দোষ গিয়ে পড়ে নারীর ওপর। সন্তানের অসুখে, পরীক্ষার খারাপ ফলাফলে যেন পিতার কোন দোষ নেই, সব দোষ কর্মজীবী নারীর।

যে সব কর্মজীবী নারীর সন্তান দেখাশোনার জন্য পরিবারে কেউ নেই তাদের অনেকেই সন্তানের জন্য কাজ ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। আর যারা কষ্ট করে চাকরি করছেন ও সন্তান পালন করছেন তারা দুটি একসঙ্গে সামলাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন। করোনা ভাইরাসের এই দুর্যোগকালিন সময়ে সেটি হয়ে উঠেছে আরও ভয়াবহ।কর্মজীবী মায়েরা না পারছেন কাজ ছেড়ে দিতে আবার না পারছেন ঠিকমত ধরে রাখতে।উভয় সংকটে পড়ে তিনি এবং তার সন্তানকে ঝুকির মধ্যে দিন কাটাতে হচ্ছে।

4 জুন 2020