করোনার লকডাউনে সাধারণের অবস্থা

পথে নেমে আসো এবং বুঝতে চেষ্টা করো কে কেমন আছে, কী পরিমান অর্থ কষ্টে আছে। তবেই বুঝতে পারবে লকডাউন সবার জন্য সব দেশের জন্য সব মানুষের জন্য সব এলাকার জন্য সমান নয়। যারা দিন মজুর একদিন বসে থাকলে চুলা জ্বলে না তাদের কাছে লকডাউনের কোন মূল্য নেই কারণ তাদের কাছে জমানো কোন টাকা নেই যা দিয়ে তারা একমাস বসে বসে খাবে।

যদি তাদেরকে লকডাউনের সময় খাবারের ব্যবস্থা করে দেওয়া যেতো, বাড়ি ভাড়ার ব্যবস্থা করে দেওয়া যেতো তবে তারা নিশ্চই বের হতো না। যারা মার্কেট করতে গিয়েছে তাদেরকে বেয়াক্কেল বলা যেতেই পারে কিন্তু যারা দোকান খুলেছে তারা আসলে বাধ্য হয়ে দোকান খুলেছে। অনেকটা সেই সব চাকুরীজীবীদের মত যাদের খুব ইচ্ছে ঘরে থাকার কিন্তু অফিসের চাপে তাদের বাধ্য হয়ে বের হতে হচ্ছে এবং অফিস করতে হচ্ছে।

ঠিক একই ভাবে ওই সব খেটে খাওয়া মানুষদেরও ইচ্ছে হয় ঘরে থাকার কিন্তু ঘরে থাকলে খাবে কি? যারা এখনো ছাত্র,এখন যারা বাসায় আছো, খুব সহজে বলি মাইন্ড করো না, তুমি বাবার পাশে গিয়ে বসো এবং বাবাকে প্রশ্ন করো, বাবা যদি এমন হতো যে তোমার কোন সঞ্চয় নেই, যা আয় তাই ব্যয় এবং এই লকডাউনে তোমাকে ঘরে থাকতে বলা হচ্ছে তুমি কি করতে? তোমার বাবা বিষয়টি ভালো উপলব্ধি করতে পারবে এবং তোমাকে নিশ্চই ভালো কিছু বলবে।

আমি ঘুরে ঘুরে দরিদ্র মানুষগুলোকে দেখেছি, তাদের মূখের দিকে তাকানো যায় না। মায়া হয়, অগণিত রিকশা চালক রাস্তায় খালি রিকশা নিয়ে একটা যাত্রীর জন্য অপেক্ষা করে কিন্তু পায় না। তুমি এক রিকশায় উঠলে অন্য রিকশাওয়ালা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। হয়তো ভাড়া পাবে বিশ টাকা কিন্তু সেই বিশ টাকাই তাকে অনেক টুকু আশা দিবে। মনে হবে আরেকটা যাত্রী দরকার, তাহলে আরো বিশ টাকা হবে এবং এভাবে তার একটু একটু আশা জাগে।

কারণ সে জানে, তার দুইশো টাকা দরকার। তবেই চারজনের সংসারে দু বেলা দু মুঠো ভাত জুটবে। এই সময়ে সব কিছুর দামও যথেষ্ট বেড়েছে । যেখানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক সময়েও ওরা খেয়ে না খেয়ে বেঁচে থাকতো, সেখানে এখনতো পরিস্থিতি আরও কঠিন। কঠিন সময়ে সবাইকে আসলে দোষ দেওয়া যায় না।

দেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা কত? দরিদ্র বলতে যারা লকডাউনে কাজে না গেলে না খেয়ে থাকতে হবে? নিশ্চই এই সংখ্যা ১০ কোটি নয়। আমার ধারণা এই সংখ্যা ৩ থেকে ৫ কোটির মধ্যেই থাকবে। এই ভয়াবহ সময়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সরকারী,বেসরকারী ভাবে যে পরিমান সহযোগিতা করা হয়েছে তার একটা হিসাব করলে বুঝা যেত কী পরিমান সহায়তা করা হয়েছে এবং সেটা যদি সারা দেশের সব হতদরিদ্রের মধ্যে সঠিক ভাবে বন্টন করা হতো তাহলে তিন মাস কড়া লকডাউন দিলেও কেউ ঘর থেকে বের হতো না। দরকার হতো না।

আপনি সাধারণ প্রতিষ্ঠানের কথা বাদ দিন ব্যাংকের মত আর্থিক প্রতিষ্ঠানও এখন টালমাটাল। বাংলাদেশ ব্যাংক ঘোষিত প্রণোদনা এখনো সব ব্যাংক তাদের কর্মচারিদের বিতরণ করেনি। অথচ যে ব্যাংক সর্বনিম্ন লাভ করেছে তারও অন্তত ১০০ কোটি টাকা লাভ হয়েছে। সেখান থেকে প্রণোদনা দিলে হয়তো ২ থেকে ৫ কোটি টাকাই যাবে কিন্তু সেটাতো তাদেরকে দেওয়া হচ্ছে যারা প্রতিষ্ঠানকে লাভবান করিয়েছে সারা বছর পরিশ্রম করে। আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মত শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানও যেখানে চিন্তিত সেখানে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ যারা দিন আনে দিন খায় তাদের লকডাউনে থাকার মত অবস্থা নেই।

এবারের দুর্যোগ আমরা কোন না কোন ভাবে ইনশা আল্লাহ পার করে ফেলবো কিন্তু ভবিষ্যতে আরও দুর্যোগ আসবে না তা তো আমরা জানি না। সেই সব দিনে আমরা কিভাবে পরিস্থিতি মোকাবেলা করবো তা এখন থেকেই ভাবতে হবে। অভাবী মানুষের তালিকা থাকতে হবে। আর এই তালিকা করাতো সরকারের জন্য ওয়ান টুর ব্যাপার। ওয়ার্ড কাউন্সিলর,মেম্বর,কমিশনার এভাবে সব পর্যায়ে লোক আছে। একজন কাউন্সিলর খুব সহজেই বের করতে পারবেন তার এলাকায় কতজন অভাবী মানুষ আছে বা কতজন মানুষ এমন দুর্যোগকালীন সময়কে মোকাবেলা করার ক্ষমা রাখে না। এভাবে এলাকাভিত্তিক তালিকা তৈরি করে সারা দেশের পরিস্থিতি জানা অবশ্যই সম্ভব এবং সে ক্ষেত্রে টোটাল কত জন হতদরিদ্র আছে এবং তাদের কি পরিমান সহযোগিতা দরকার তা বের করা সম্ভব। আর আপদকালীন সময়ে সেভাবেই সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া সম্ভব।

শুধু সচেতনতার কথা বলে তেমন কোন লাভ নেই বরং সহযোগীতার হাত বাড়াতে হবে। আমার নিজের ভালো থাকতে হলে অন্যকে ভালো রাখতে হবে। তবে সেই আমাকে ভালো থাকার সুযোগ দিবে।

–জাজাফী
১৭ মে ২০২০