গুলজারিলাল

-জাজাফী

হঠাৎ করেই গৃহহীন হয়ে পড়লেন গুলজারিলাল। দিল্লিতে তার থাকার মত আর কোন জায়গা নেই।গত কালও দিল্লি,আগ্রা,পুনে,হায়দ্রাবাদ,মাদ্রাজ,কলকাতা সহ সারা দেশের যে কোন শহরে সে অনায়াসে থাকতে পারতো আজ তার কোনটাই নেই। বিশাল বাড়ি,গাড়ী,গৃহপরিচারিকা,দারোয়ান যা কিছু ছিলো তা আর তার রইলো না। যেন ভোজবাজির মত সব উধাও হয়ে গেলো।সকালের নাস্তাটা যে টেবিলে বসে তিনি খেয়েছিলেন দুপুরের খাবার খাওয়ার সময় সেই টেবিলটা সেখানে থাকবে কিন্তু তিনি থাকবেন না। আগের মতই তার পাশে তার স্ত্রী থাকবে,কন্যা থাকবে,পুত্র থাকবে কিন্তু সেই চিরচেনা ঘরটা থাকবে না।

সকালের নাস্তা করতে করতে গুলজারিলাল ডাইনিং টেবিলে বসে চারদিকটা একবার দেখলেন। কত চেনা ভূবন একটু পর কত অচেনা হয়ে যাবে। আর কোন দিন এই ডাইনিং টেবিলে বসে খাওয়া হবে না। হিসাব মেলাতে গিয়ে তিনি দেখলেন সারা জীবনে তার সঞ্চয় বলতে তেমন কিছু নেই। শহরের কোথাও তার একটা নিজের বাড়ি নেই। অথচ তিনি জানেন যে গাড়ি চালক তার গাড়ি চালাতো সেও দিল্লিতে একটা দোতলা বাড়ি করেছে। নিচ তলা ভাড়া দিয়ে নিজেরা উপরতলায় থাকে। বেতনের টাকায় তাকে আর হাত দিতে হয় না। বাড়ি ভাড়া যা পায় তা দিয়ে দিব্যি সংসার চলে যায়। অথচ গুলজারিলালের বাড়ি তো দূরের কথা যাতায়াতের জন্য নিজের একটা গাড়িও নেই। পরিবারের বাকি সদস্যরাও যেন এক একজন গুলজারিলাল। কোন দিন তারা আক্ষেপ করে,অনুযোগ করে বলেনি আমাদের কেন নিজেদের একটা বাড়ি হলো না,গাড়ি হলো না।

নাস্তা শেষে এক কাপ চা খেয়ে উঠে পড়লেন গুলজারিলাল।নিজের রুমে গিয়ে একটা ছুটকেস হাতে নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন।এই ঘরে তার বলতে কিছু নেই। যে ছুটকেস নিয়েছেন তাতে তার পরবার মত কয়েকটা কাপড় আর কিছু ওষুধ আছে। ঘরে বাকি যা কিছু আছে তা তেমনই থেকে যাবে। আসার সময় এই সুটকেসটা সাথে নিয়ে এসেছিলেন, যাওয়ার সময়ও তাই।তাঁর স্ত্রী ও একটা সুটকেস হাতে বেরিয়ে এলেন। পুত্রকন্যাদের হাতে দুটো করে ব্যাগ। একটাতে কাপড়, অন্যটিতে কিছু বইখাতা।যে ঘর ছেড়ে তিনি বেরিয়ে যাচ্ছেন সেই ঘর বিগত দিনে তাকে আগলে রেখেছিলো।এই বাড়িটার প্রতি মায়া জন্মে গেছে। কিন্তু তাকে সব মায়া কাটিয়ে চলে যেতে হবে। এখানে থাকার আর কোন সুযোগ তার নেই। আশেপাশে অন্য কোথাও বাসা ভাড়া করে থাকার মত সক্ষমতাও নেই গুলজারিলালের। বাধ্য হয়ে তাকে ফিরে যেতে হচ্ছে গ্রামের বাড়িতে। বাসা থেকে বের হতেই দুইপাশে বাসার কাজের মানুষেরা সারি ধরে দাড়িয়ে গেলো।

তাদের চোখ ছলছল করছে। সুযোগ পেলে তারা হয়তো কাঁদতে কাঁদতে ছুটে এসে জাপটে ধরতো। ড্রাইভার দাড়িয়ে আছে তাদের পৌছে দেবে বলে। গুলজারিলাল বললেন আমরা বরং বাস ধরে চলে যেতে পারবো।ড্রাইভার  আর কিছু বলতে পারলো না। বিগত পাঁচ বছর এই মানুষটিকে সে ড্রাইভ করে বিভিন্ন যায়গায় নিয়ে গেছে আজ শেষ দিনে তাকে নেওয়া হলো না।গুলজারিলাল এবং তার পরিবার সবাইকে হাত নাড়িয়ে বিদায় নিলেন। গেট পেরিয়ে একবার পিছন ফিরে তাকালেন, হয়তো শেষ বারের মত বাড়িটাকেও বিদায় বললেন।

তাঁর এই চলে যাওয়ার দিনে কোথাও কোন আয়োজন নেই। তিনি সবাইকে নিষেধ করেছিলেন কোন আয়োজন করতে। সাধারণ পোষাকের গুলজারিলালকে কেউ সেভাবে খেয়ালই করলো না। একশো কোটি মানুষের দেশে কে কার দিকে ভালোভাবে তাকায়। অথচ গতকাল অব্দি এই মানুষদের চোখেই তিনি ছিলেন ভীষণ কাঙ্খিত ব্যক্তি।তাঁর দর্শন পেতে মানুষ বহুদিন আগে থেকে অপেক্ষা করতো। বাসস্ট্যান্ডে একটি বেঞ্চিতে বসে বাসের অপেক্ষা করতে করতে পুরোনো দিনের সেসব কথাই মনে পড়ছিলো  গুলজারিলালের। পাশে নিরবে বসে আছে তার স্ত্রী,পুত্র,কন্যা। দু’একজন পথচারি তাদের দিকে তাকাচ্ছে এবং কেউ কেউ হয়তো বিভ্রান্ত হচ্ছে,কারো কারো কাছে চেনা চেনাও লাগছে কিন্তু সাহস করে বলতে পারছেনা যে আপনিই গুলজারিলাল কি না!

নির্ধারিত সময়ের বিশ মিনিট পর বাস আসলো।গুলজারিলাল পরিবার সহ উঠে পড়লেন।পরিবারের মোট সদস্য চারজন।পাশাপাশি সিট মেলেনি। সামনে পিছনে দুই সিট করে মোট চার সিট পেয়েছেন।ছেলে মেয়ে দুটো সামনের দুই সিটে বসেছে আর তিনি এবং তার স্ত্রী বসেছেন এক সিট পিছনে।গুলজারিলাল লক্ষ্য করে দেখলেন অনেকক্ষণ যাবৎ পাশের সিটের ভদ্রলোক তাঁর দিকে তাকিয়ে আছেন,বিস্ময় ভরা চোখে।কন্ডাক্টর টিকেট চেক করে চলে যাওয়ার পর সেই ভদ্রলোক বললেন স্যার আপনি মাননীয় গুলজারিলাল স্যার না? গুলজারিলাল মুখে হাসি রেখে সম্মতি জানালেন।

লোকটার চোখ কপালে ঠেকলো। তিনি বললেন স্যার আপনি এই পাবলিক বাসে? কোথায় যাচ্ছেন?গুলজারিলাল বললেন গ্রামে চলে যাচ্ছি। দিল্লি শহরে আমারতো থাকার জন্য নিজের কোন ঘর নেই। সরকার যে ঘর দিয়েছিলো সেখানে থাকার আজই শেষ দিন ছিলো। যে ভদ্রলোক গুলজারিলালের সাথে কথা বলছিলেন তার পাশের সিটের ভদ্রলোক তাকে প্রশ্ন করলেন এই লোকটি কে? সেই যাত্রী বললেন আপনি ওনাকে চিনতে পারছেন না? ভালো করে দেখুনতো চিনতে পারেন কি না? কথা মত লোকটা ভালো করে তাকিয়ে দেখলেন। বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলেন। ঘোর কাটতেই তিনি জোরে বলে উঠলেন ভারতের সদ্য বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী গুলজারিলাল স্যার এই বাসে আমাদের সাথে ভ্রমন করছেন!! তার কথা শুনে সবাই ফিরে তাকালো।

বাসের সিটে বসা ভাবলেশহীন শান্ত চেহারার যে মানুষটি স্ত্রী পুত্র কন্যাকে নিয়ে দিল্লি ছেড়ে গ্রামে চলে যাচ্ছেন দিল্লিতে তার থাকার কোনো জায়গা নেই বলে তিনি ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী গুলজারিলাল নন্দ। গতকালও যিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন।সামান্য ওয়ার্ড কাউন্সিলরদেরও যেখান নিজেদের বাড়ি,গাড়ি আছে সেখানে গোটা দেশের প্রধানমন্ত্রী হয়েও দিল্লিতে তাঁর নিজের কোন বাড়ি নেই,ভাড়া করে থাকার মত ব্যবস্থা নেই!

গন্তব্যে পৌছার পর তিনি যখন পরিবার সহ বাস থেকে নামলেন, দেখতে পেলেন বাসের জানালায় সারি সারি ‍মুখ। তাঁর দিকে অপলোক চোখে তাকিয়ে আছে। সেই চোখে মুগ্ধতা ফুটে উঠছে। গুলজারিলাল মনে মনে ভাবলেন কে বলেছে তাঁর কোন সঞ্চয় নেই? অগনিত মানুষের মনে তিনি জমা করে রেখেছেন পাহাড় সমান ভালোবাসা।

১৪ মে ২০২০