আগন্তুক পর্ব -২

ফেব্রুয়ারি মাসে আমি সাধারণত ঢাকায় থাকি।উদ্দেশ্য একুশে বইমেলা উপভোগ করা।বই কিনি সামান্যই তবে ঘুরি বেশ।আর সব থেকে ভালো লাগে লেখক কবিদের আড্ডা,আলোচনা।এভাবেই চলছে বিগত এক দশক।কিন্তু হঠাৎ সেই ধারাবাহিকতায় ছ্বেদ পড়লো।ইউনেস্কোর পরিবেশ বিষয়ক সম্মেলনে যোগ দিতে আমাকে পনের দিনের জন্য বই মেলার মায়া ত্যাগ করতে হলো।২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারির ৩ তারিখ আমি রওনা হলাম ফুটবলের স্বর্গরাজ্য স্পেনে।

বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছাত্রছাত্রীদের অংশগ্রহনে সেবার বিশাল কর্মযজ্ঞের আয়োজন করা হয় স্পেনের ফুটবলমুখরিত রাজ্য বার্সেলোনা শহরে।শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত ইউনিভার্সিটি অব বার্সেলোনা ছিলো অনুষ্ঠানের ভেন্যু।বিশ্ববিদ্যালয়ের অদূরে আমার হোটেল ক্যাটালোনিয়া অ্যাটিনাস।বিশ্বের উনপঞ্চাশটি দেশ থেকে প্রায় সাড়ে সাতশো ছাত্র ছাত্রী এ আয়োজনে অংশ নিতে উপস্থিত হয়েছে বার্সেলোনাতে।বাংলাদেশ থেকে আমি,রাহবার,ফাইরুজ,জিদান,মেহরুন আর থমাস অংশ নিয়েছি।থমাস অস্ট্রেলিয়ান হলেও বাবা মায়ের চাকরির সুবোদে ক বছর হলো বাংলাদেশেই আছে।


পরিবেশ বিষয়ক সম্মেলনের কাযর্ক্রম শেষ হওয়ার পরও যখন আমাদের হাতে তিনদিন সময় ছলো তখন আমরা বিশেষ করে আমি ঘুরতে বের হই।লা নুয়েভা মার্কুয়েসাতে বসে সেই যে দেখা হয় এক আগন্তুকের সাথে যিনি আমাকে আমার আজন্মের স্বপ্ন পুরণে সহযোগিতা করেন।সে গল্প আমি আগেই বলেছি।ফুটবল খেলা দেখা শেষ করে আমি যখন চলে আসবো তিনি আমাকে অপেক্ষা করতে বললেন তার ছেলের সাথে দেখা করাবেন বলে।আমি অপেক্ষা করে যখন তার ছেলের সাক্ষাৎ পেলাম তখন বাকরুদ্ধ।সেই ছেলেটি আর কেউ নয় বার্সেলোনা দলের বিখ্যাত খেলোয়াড় জর্ডি আলবা।

সেবার স্পেন ভ্রমন আজীবন মনে রাখার মত ছিলো।লিখে সবার সাথে শেয়ার করার লোভ সামলাতে পারলাম না।আমি যেন স্বপ্ন দেখছিলাম,যেন কল্পনার রাজ্যে হারিয়ে গিয়েছিলাম।সত্যিইকি আমি স্পেনে এসেছি? সত্যিইকি আমি ন্যু ক্যাম্পের ভিআইপি গ্যালারিতে দাড়িয়ে আছি? সত্যিই কি আমার সামনে জর্ডি আলবা?আমি তাকে বললাম আমিকি আপনাকে ছুয়ে দেখতে পারি?আমাকে অবাক করে দিয়ে তিনি নিজেই আমাকে ছুয়ে দিয়ে বললেন তুমি স্বপ্ন দেখছো না!এটা সত্যি!


কিছু স্মৃতি আজীবন আনন্দের সাথে বুকের মধ্যে বয়ে বেড়ানোর মত।এটিও তেমনই স্মৃতি।একটা অটোগ্রাফ নিতে পারলে দারুণ হতো।সবাইকে দেখানো যেতো।পকেট হাতড়েও কোন কাগজ পাইনি।হায় আফসোস বৃদ্ধর সাথে যখন গাড়িতে বসে ছিলাম ভুল করে মোবাইলটাও সীটের উপর ফেলে এসেছি।ছবি তোলার সুযোগটাও হাতছাড়া হয়ে গেলো।এতো আনন্দের ভীড়ে একঝাক দুঃখ জমা হয়ে থাকলো।রাত দশটার দিকে হোটেলে ফিরে এলাম।বার্সেলোনা শহরের হোটেল গুলোর মধ্যে ক্যাটালোনিয়া অ্যাটিনাস বেশ নামকরা।এতো সুন্দর হোটেল যে চোখ জুড়িয়ে যায়।হোটেলে ফিরে পুরো ঘটনাটা যখন সবাইকে বললাম তখন কেউ বিশ্বাস করেনি।তারা ধরেই নিয়েছে আমি কোন গল্প ফেঁদেছি।গল্প লেখকদের এই একটা সমস্যা।তাদের পরিচিতজনেরা দ্বিধায় পড়ে যায়।তারা বুঝতে পারেনা কোনটা গল্প আর কোনটা সত্যি।আমিও যে গল্প লিখছি না তা ওরা শিওর না।ওরা বলে এটা তোর অন্য গল্পগুলোর মতই দারুন একটা প্লট।আমি বলি এটা গল্প না,সত্যি! ওরা আরো বেশি করে অবিশ্বাস করে।


ফাইরুজ আমাকে প্রশ্ন করলো যদি এটা সত্যি হয় তবে মেসি বা অন্যদের সাথেও কেন দেখা করলি না?আমি ওদের বললাম কি করে দেখা করবো বল? আমি তখন পুরো ঘোরের মধ্যে ছিলাম।এতোটা বিস্মিত জীবনে আগে কখনো হইনি।ওরা পিট চাপড়ে বললো গল্প হোক আর সত্যি হোক বিষয়টি সত্যিই রোমাঞ্চকর।আমি কিছু বললাম না।আমার বলার ছিলো বলেছি।কারো সত্যি মনে হলে সত্যি কারো গল্প মনে হলে গল্প।


ঢাকার মতই বার্সেলোনা শহরও যেন সারা রাত জেগে থাকে।সেদিন আমার ঘুমই আসছিলো না।বার বার চোখের সামনে পুরো দিনের চিত্র ভেসে উঠছিলো।লা নুয়েভা মার্কুয়েসার সেই স্যুপ খাওয়ার দৃশ্য,বৃদ্ধর সাথে কথোপকথন এবং শেষে খেলা দেখার পর জর্ডি আলবার সাথে দেখা হওয়া।জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আলোঝলমলে শহরটা দেখি।শহরের প্রতিটি আলোকবাতিতে যেন ভেসে ওঠে এক একটি দৃশ্যকল্প।সেরাতে মনে হয় ঘুমের মধ্যেও একই দৃশ্য স্বপ্ন হয়ে আবার আমার কাছে ফিরে আসে।


পরদিন সকালে দেরিতে ঘুম ভাঙে।উঠে দেখতে পাই আমার দলের অন্যরা ঘুরতে বেরিয়েছে।ওরা হয়তো আমাকেও ডেকেছিল কিন্তু আমি ঘুমে বিভোর ছিলাম তাই টের পাইনি।বিছানা ছেড়ে উঠে গোসল সেরে বেরিয়ে পড়লাম।একাকী ঘুরে বেড়ানোর আনন্দই আলাদা।পুরোপুরি স্বাধীনতা ভোগ করা যায়।অন্যদের সাথে ঘুরতে বের হলে তাদের মতামত,ভালো লাগা মন্দ লাগাও গুরুত্ব দিতে হয়।হয়তো একটা জিনিষ আমার ভালো লেগেছে একটু দেখবো বলে দাড়িয়েছি অন্যদের সেটা ভালো লাগেনি বলে তারা চলে যেতে চায়।সে কারনেই একাকী ঘুরতে বেশি ভালো লাগে।ব্রেকফাষ্ট করতে করতেই পরিকল্পনা করলাম আজ মাদ্রিদ যাবো।

যে ভাবনা সেই কাজ।দ্রুত পৌছে গেলাম প্লাসা ডেলপিসো ক্যাটালোনিয়াতে।বার্সেলোনার রেলওয়ে স্টেশান।প্রতিদিন এই স্টেশান থেকে ১৮টি ট্রেন মাদ্রিদের পথে ছেড়ে যায়।দ্রুতগামী সেই ট্রেনে আড়াই ঘন্টার মধ্যেই মাদ্রিতে পৌছে গেলাম।৩২ ইউরো খরচ করতে খুব বেশি কষ্ট হয়নি।বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেটের বাইরে নিজেও কিছু অর্থ নিয়ে এসেছিলাম।ট্রেন যে স্টেশানে গিয়ে আমাকে নামিয়ে দিলো সেটার নাম অ্যাভেনিডা ডি মাদ্রিদ।মাদ্রিদের এই স্টেশানে পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে আগত পযর্টকে মুখরিত থাকে।প্রতিনিয়ত কেউ আসছে নয়তো চলে যাচ্ছে।


শহর দেখতে বেরিয়ে পড়লাম।এই শহরে মানুষ খুব হাটতে ভালোবাসে।আমিও মনের আনন্দে হেটে বেড়াচ্ছি।রোদের প্রখরতা নেই।শীতের দেশে রোদটাও উপভোগ্য হয়।আমি যখন সেগোভিয়া স্ট্রিট দিয়ে হেটে চলছি তখন অবাক হয়ে দেখলাম লম্বা চুল দাড়িওয়ালা একটা লোক একটা ফুটবল নিয়ে কারিকুরি করছে।পথচারিদের দু একজন একনজর দেখেই যে যার কাজে চলে যাচ্ছে।ফুটবলের প্রিয়ভূমি স্পেনের অলিতে গলিতে ফুটবল নিয়ে মেতে থাকবে এটাই স্বাভাবিক।কিন্তু আমার মনে হলো বাংলাদেশের অলিতে গলিতে যে হারে ফুটবল নিয়ে মাতোয়ারা হতে দেখা যায় এই দেশে সেরকম নেই।আর তাইতো একাকী সেই বয়স্ক মানুষটির ফুটবল খেলার প্রতি কারো কোন ভ্রুক্ষেপ নেই।


পাশেই একটা চেয়ারের উপর সেই মধ্যবয়স্ক লোকটির কাপড় রাখা।একটা বোতলে পানিও রেখেছেন।সেই সাথে আছে একটা কুকুর।এই সব দেশের মানুষেরা কুকুর খুব পছন্দ করে।কাছাকাছি গিয়ে দেখলাম একটা বড় ম্যাজিশিয়ান টুপির মত টুপি রাখা।আমার মনে হলো লোকটা আসলে ফুটবলের কারিকুরি দেখিয়ে ভিক্ষা করছে।আমি আগেও দেখেছি এই সব উন্নত দেশের ভিক্ষুকেরা কখনো কোন কিছু না করে ভিক্ষা নেয় না।তারা হয় ম্যাজিক দেখাবে নয়তো গান শোনাবে নয়তো অভিনয় করে দেখাবে।কিছুনা কিছু প্রতিভা দেখিয়ে তবেই ভিক্ষা নিবে।লোকটিকে ফুটবল নিয়ে খেলা দেখানো দেখে সেটাই মনে হলো।দু একজন পথচারি অবশ্য কিছু দিতে চেষ্টা করলো।লোকটার জন্য আমার খুব মায়া হচ্ছিল।বাংলাদেশে ফার্মগেট ওভার ব্রিজের উপর থালা হাতে নিয়ে দাড়ালে সে নিশ্চিত হাজারখানেক না হোক দুই চারশো টাকা পেয়ে যেতো।


আমার খুব ইচ্ছে হচ্ছিল তার সাথে গিয়ে ফুটবল খেলার আনন্দটুকু উপভোগ করি।শুধু তাই নয় ইচ্ছে হচ্ছিল তাকে গিয়ে বলবো জানো গতকাল ন্যু ক্যাম্পে খেলা দেখেছি আর হ্যান্ডশেক করেছি জর্ডি আলবার সাথে।মনে মনে এসব ভাবলেও কিছুই বলা হয়নি।আমাদের দেশে হলো এতোক্ষণে তার সাথে ফুটবল খেলার জন্য অনেক ছেলেপুলে বুড়ো মানুষও জুটে যেতো।আমাদের দেশে কারো কাছে বল দেখলেই সবাই নিমিষেই খেলোয়াড় হয়ে যায়।মনে পড়ে গ্রামে ছেলেরা চাঁদা তুলে ফুটবল কিনতো।তার পর খেলতে গিয়ে যদি মনোমালিন্য হতো তবে সবাই সেই নতুন বলটা কেটে ভাগ করে নিতো! আমি আরো খানিকক্ষণ দাড়িয়ে লোকটির নিঃসঙ্গতা অনুভব করতে চেষ্টা করলাম।যেহেতু গল্প লিখি তাই মনে মনে তাকে নিয়েও কোন গল্প লেখা যায় কিনা ভাবতে থাকি।

পাশেই একটা পপকর্নশপ ছিলো।এক ইউরো খরচ করে একপ্যাকেট পপকর্ন কিনি।তখন দেখতে পাই একটা বার বছরের ছেলে জুটে গেছে।সে লোকটার দিকে বল মারছে আবার কখনো কখনো লোকটাও তার সাথে বল নিয়ে কাড়াকাড়ি করছে।দেখতে খুব ভালো লাগছে।
এই দেশটা খুব সহনশীলতার দেশ।খেলতে খেলতে লোকটা এমন সব কান্ড করেছে যে আমাদের দেশ হলে তুলকালাম লেগে যেতো।পাশ দিয়ে হেটে যাওয়া এক তরুনীর কাছে সে তার মোবাইল নাম্বার চাইলো আর তরুণী তখন একটা মুচকি হাসি দিয়ে দুঃখিত দেওয়া যাবেনা বলে চলে গেলো।আশে পাশে যারা ছিলো কেউ কিছু মনেই করলো না।আমি ভাবলাম এই ঘটনাটা যদি ঢাকায় হতো তাহলে কি হতো?এতোক্ষণে লোকটাকে ঢাকা মেডিকেলে ভর্তি করতে হতো।তার চুলগুলো ছিলো বেশ লম্বা,ব্রাউনী।দাড়ি গোফ দেখলে মনে হয় জঙ্গল থেকে উঠে এসেছে।ঢাকার রাস্তায় হাটলে নিশ্চিত টোকাই শ্রেনীর ছেলেপুলে তার দিকে পাগল পাগল বলে ঢিল ছুড়তো।এখানে তার কিছুই হলো না।

কেউ যখন তাকে কোন পাত্তাই দিচ্ছিলো না তখন একটা বার তের বছরের ছেলে এগিয়ে আসলো।তার সাথে ফুটবল খেলায় মেতে উঠলো।লোকটা তখন খুব খূশি।এতো সময় এখানে ফুটবল নিয়ে কারিকুরি করেও কারো নজর কাড়তে পারলো না।দু একজন হয়তো অল্প কিছু কয়েন ছুড়ে দিলো টুপিতে।বার তের বছর বয়সী ছেলেটা দেখতে খুব সুন্দর আর মিষ্টি চেহারার অধিকারী।ছোটরা স্বভাবতই খেলাধুলা পছন্দ করে।নিঃসঙ্গ মানুষটিকে যখন একাকী ফুটবল নিয়ে মেতে থাকতে দেখলো সেও এগিয়ে আসলো।ছেলেটির সঙ্গ নিশ্চই লোকটি উপভোগ করলো।তার সাথে বেশ কিছুক্ষণ ফুটবল খেললো।

পথচারিরা এসব দৃশ্য দেখে হয়তো অভ্যস্ততাই কেউ কৌতুহলী নয়।আমাদের দেশে রাস্তার মাঝে খেলাতো দূরের কথা দাড়ানোই যায় না।আর এখানে দিব্ব্যি ফুটবল খেলছে।অনেক ক্ষণ খেলে সম্ভবত লোকটা ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল।আমার কাছে অন্তত তাই মনে হলো যখন দেখলাম লোকটা ফুটবল হাতে তুলে নিলো।তার পর ছেলেটিকে প্রশ্ন করলো তোমার নাম কি? ছেলেটি বললো তার নাম নিকোলাস।লোকটি পকেট থেকে একটা মার্কার বের করে ফুটবলের গায়ে লিখে দিলেন নিকোলাসকে ধন্যবাদ আমার সাথে ফুটবল খেলার জন্য।এর পর নিচে তার নিজের নাম সই করে দিলেন।


নিকোলাস ফুটবলটি পেয়ে যতটানা আনন্দিত হলো তার চেয়েও তার বিস্ময়ের সীমা থাকলো না যখন নিজের নামের নিচে সেইমানুষটির সিগনেচার দেখলো। এই সিগনেচার সে অনেক আগেই ইন্টারনেট থেকে সংগ্রহ করেছে।ছেলেটি লম্বা চুল দাড়িগোফ ওয়ালা লোকটার মূখের দিকে তাকালো। নাহ তাকে সে চেনে না।অথচ তার করা সিগনেচারটা সে চেনে। পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ চেনে।লোকটা হয়তো নিকোলাসের মনের ভাষা বুঝতে পারলেন।তিনি এক টান দিয়ে দাড়ি গোফ খুলে ফেললেন!তার পর চুলও খুলে ফেললেন।তারমানে তিনি ছদ্মবেশে ছিলেন।

কিছুক্ষণ আগেও যারা মোটেই আমলে দেয়নি তারাও তখন তাকে দেখে মোবাইল,ক্যামেরা যে যেভাবে পারে স্মৃতি ধরে রাখার জন্য উল্লাস করতে করতে তার পাশে ঘিরে ধরে।নিকোলাস নামের ছোট্ট ছেলেটি ফুটবল হাতে তার মুখের দিকে তাকায়।দেখতে পায় একটু আগে সে যার সাথে ফুটবল নিয়ে মেতে উঠেছিল তিনি এই গ্রহের অন্যতম সেরা ফুটবলার ক্রিষ্টিয়ানো রোনালদো।


হঠাৎ করে লোকটিকে ঘিরে এতো ভীড় কেন বেড়ে গেলো প্রথমে বুঝতে পারিনি।ভীড় ঠেলে সামনে যাবো তারও সুযোগ পাইনি।একজনের কাছে জানতে চাইলাম হঠাৎ এতো মানুষের ভীড় কেন লোকটাকে ঘিরে?একটু আগেওতো কেউ তাকে পাত্তা দিচ্ছিলো না।সে কি তবে ছেলে ধরা?ওই ছেলেটাকে কি সে ধরে নিয়ে যেতে চেয়েছিল?আমার এক নাগাড়ে এতো গুলো প্রশ্ন শুনে লোকটা চোখ কপালে তুললো।বললো তুমি এসব কি বলছো! চুল দাড়িওয়ালা ওই লোকটা আর কেউ নয় স্বয়ং ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো!! এটা শুনে আমি হুড়মুড় করে এগিয়ে গেলাম।দেখতে পেলামনা ভীড়ের কারণে তবে চারপাশে যারা তাকে ঘিরে এগোচ্ছিল তারা চিৎকার করে বলছিলো ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো!আমি তখন পুরোপুরি ঘোরের মধ্যে।ইস তিনি যখন ছদ্মবেশে একাকী ফুটবল নিয়ে কারিকুরি করছিলেন তখন কেন আমি তাকে চিনতে পারিনি? কেন কাছে গিয়ে তার সাথে ফুটবল খেলিনি!!


সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে।হোটেলে ফিরতে হবে।ঘোরের মধ্যে আছি।গতকালকের চেয়েও বেশি বিস্মিত আমি।স্পেনে এসে পরিবেশ বিষয়ক সম্মেলনের আয়োজকদের কাছে কৃতজ্ঞতার শেষ নেই।তারা সুযোগ দিয়েছিল বলেই এমনদুটি অসাধারণ ঘটনার সাক্ষী হলাম।মনে মনে ভাবলাম হোটেলে ফিরে গিয়ে এ ঘটনাটা সবাইকে জানাবো।পরে মনে হলো ওরা এটাকেও গল্প হিসেবে ধরে নেবে।সবর্শেষ ট্রেন ছিলো রাত আটটায়।সেই ট্রেনে হোটেলে ফিরলাম।তখনো সবাই জেগে আছে।আমি উত্তেজনা দমিয়ে রাখতে পারছি না।

পুরো ঘটনাটা ওদেরকে খুলে বললাম।ওরা হাত তালি দিলো।বললো আমার গতকালকের গল্পটার চেয়েও এটা বেশি ভালো হয়েছে।আমি ওদের কি করে বুঝাই যে এটা গল্প না সত্যি।বিশ্বাস না করলেও আমার কিছু যায় আসে না।আমি ফ্রেশ হয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিলাম।তন্দ্রা মত এসেছে এমন সময় রাহবার আমাকে জাগিয়ে তুললো।সে ভীষণ উত্তেজিত।দেখলাম ওর হাতে মোবাইল।ইউটিউবের একটা ভিডিও দেখে সে উত্তেজিত।

চোখ কচলে ভিডিওটির দিকে তাকিয়ে চমকে উঠলাম। এটাতো সেই জায়গা যেখানে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো ছদ্মবেশ নিয়ে এসেছিলেন।তার পর পুরো ভিডিওটা দেখলাম কয়েকবার। রোনালদো আন্ডারকভার শিরোনামে ভিডিওটি আপলোড দেওয়া হয়েছে যা এখনো ইউটিউবে আছে। তিনি যে ওখানে আসবেন এটা আগে থেকেই ঠিক করে ওনাকে প্রস্তুত করা হয়েছিল।কিন্তু কেউ বুঝতেই পারেনি পৃথিবী বিখ্যাত মানুষটি তাদের মাঝেই বিচরণ করছেন।আমার টিমের জুনিয়র ছেলে জিদান বললো ভাই আপনার কথাতো সত্যি! আমরা আরো ভেবেছিলাম আপনি লেখক মানুষ তাই গল্প লিখেছেন।এবারতো প্রমান মিললো।তার মানে জর্ডি আলবার সাথে দেখা হওয়াটাও গল্প নয় সত্য!!
জিদানের কথার কোন জবাব দিলাম না।শুধু মিষ্টি করে একটা হাসি দিলাম।এখানে আমার বলার কিছু নেই।আমিতো আগন্তুক মাত্র।


৬ মার্চ ২০১৯

আগন্তুক পর্ব-১ পড়তে ক্লিক করুন