কিয়ামতের আগে

চারদিকে সুনশান নিরবতা। কোথাও কেউ জেগে নেই। ভুতুড়ে অন্ধকার চারদিক আরও নিস্তব্ধ করে রেখেছে।রাত সাড়ে তিনটার দিকে মোবাইলের ক্রিং ক্রিং শব্দে শফিকের ঘুম ভেঙ্গে গেলো। বাসায় ফিরে রাতের খাবার খেয়ে বিছানায় যেতে যেতেই সোয়া একটা বেজে গিয়েছিল। শরীরে রাজ্যের ক্লান্তি ভর করায় শোয়ার সাথে সাথেই চোখ জুড়ে ঘুম নেমে এসেছিল। ঘুমঘুম চোখে মোবাইলের স্ক্রিনের দিকে না তাকিয়ে ফোনটা রিসিভ করলো। ওপাশ থেকে কে কথা বললো বুঝা না গেলেও শফিক এটা জানে এখন আর ঘুমিয়ে থাকা চলবে না। স্ত্রী ও একমাত্র কন্যাকে রেখে সে বিছানা ছেড়ে উঠে পড়লো।মেয়েদের ঘুম এমনিতেই খুব পাতলা হয়। কোন কিছুর শব্দ হলেই তাদের ঘুম ভাঙ্গে সবার আগে।

শফিকের স্ত্রী রোকেয়ারও ঘুম ভেঙে গেলো। সে দেখলো তার স্বামী জামা কাপড় পরে রেডি হচ্ছে বাইরে যাবার জন্য। বিয়ের পর থেকেই প্রায়ই এই দৃশ্য তাকে দেখতে হয়। এ জন্য তার কোন আফসোস নেই বরং মাঝে মাঝে গর্ব হয় স্বামীকে নিয়ে। নিজের সব সুখ বিসর্জন দিয়ে তার স্বামী রাত দিন এক করে ছুটে চলে অন্যের সুখের জন্য। অন্যের সুখ দিতে দিতেই নিজের বেচে থাকার সামান্য রোজগারটুকু হয় তার।রোকেয়াও বিছানা থেকে উঠে পড়ে।মাঝ বিছানায় শুধু শুয়ে থাকে শফিক রোকেয়ার আট বছরের মেয়ে হুমায়রা। হুমায়রা স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তৃতীয় শ্রেণীতে পড়ে। বাবাকে সে খুব কমই কাছে পায়। বাবা যখন ফেরে অধিকাংশ দিন হুমায়রা ঘুমে বিভোর থাকে। তার ঘুমন্ত মুখে বাবার আদরের চুম্বন লেগে থাকে। ভোরে যখন ঘুম থেকে ওঠে অধিকাংশ দিন তার অনেক আগেই বাবাকে কাজের জন্য বেরিয়ে যেতে হয়।

মাঝ রাতে বিছানা ছেড়ে উঠে স্বামীর পাশে গিয়ে দাড়ায় রোকেয়া। টেবিলের উপর রাখা চাবির ছড়াটি এগিয়ে দিতে দিতে বলে সাবধানে যেও। যা দিনকাল পড়ছে। কখন কার কী হয় বলা যায় না। স্ত্রীর কথায় শফিকের ভালো লাগে। তার কেবলই মনে হয় কোন কালে ভালো কাজ করেছিলাম বলেই এমন গুণবতী স্ত্রী পেয়েছি। অন্য কেউ হলে এই মাঝ রাতে কোন ভাবেই স্বামীকে যেতে দিতো না।কিন্ত রোকেয়া সবটাই বুঝতে পারে।দায়িত্বের কাছে আর সব তুচ্ছ।বিশেষ করে শফিকের উপর অন্য কারো ভালো থাকা না থাকা নির্ভর করে।রোকেয়া শুধু জানতে চায় আজ কোথায় যাবা? কিসের রুগী? শফিক স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বলে উপজেলা সদর থেকে দশ কিলোমিটার দূরে নীলগঞ্জ গ্রামে যেতে হবে।কিসের রুগী তাতো বলতে পারবো না।

রোকেয়া আর কিছু জিজ্ঞেস করে না। এরই মধ্যে শফিক টর্চ লাইট হাতে বেরিয়ে পড়ে। দশমিনিট হাটলেই সে হাসপাতালে পৌছে যাবে।তার পর সেখান থেকে গাড়ি করে যেতে হবে। শফিক ডাক্তার নয়। সে সদর হাসপাতালের একটি অ্যাম্বুলেন্সের ড্রাইভার। মাঝ রাতে হাসপাতাল থেকে ফোন করে জানানো হলো উপজেলা সদর থেকে দশ কিলোমিটার দূরে নীলগঞ্জে এক মুমুর্ষু রোগীকে আনতে যেতে হবে। এই মুহুর্তে সে ছাড়া আর কোন ড্রাইভার নেই। সেই সংবাদ পেয়েই শফিক বেরিয়ে গেলো। ভোর হতে তখনো বেশ দেরি। হাসপাতলের গ্যারেজ থেকে অ্যাম্বুলেন্স বের করে রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙ্গে অপেক্ষাকৃত ক্ষীন আওয়াজে সাইরেজ বাজাতে বাজাতে নীলগঞ্জের দিকে ছুটে চললো।

নীলগঞ্জের পাশের গ্রাম কাউখালি। শফিকদের গ্রামের বাড়ি সেটা। তাই নীলগঞ্জের অনেকের সাথেই শফিকের জানাশোনা। ভোর হতে তখনো ঢের বাকি। চারদিকে কোথাও কেউ নেই সবাই ঘুমের রাজ্যে তলিয়ে গেছে। সেই নিস্তব্ধতা ভেদ করে শফিক চলছে বিপদের দিনে কারো পাশে দাড়াতে। এটা শুধু তার চাকরি নয় বরং সে মনে করে এটা তার নৈতিক দায়িত্ব।

অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেনের শব্দ কানে পৌছাতেই মুমুর্ষু রোগীর বাড়ির লোকজন যেন খানিকটা স্বস্তি পেলো। তারা প্রস্তুত হয়েই ছিলো। শফিক পৌছার সাথে সাথে ধরাধরি করে রোগীকে অ্যাম্বুলেন্সে তোলা হলো। শফিক প্রশ্ন করেনি কিসের রোগী,কি হয়েছে। এ গুলো প্রশ্ন করার কথাও নয়। রোগীকে নিয়ে সে যতটা দ্রুত সম্ভব সাবধানে ফিরে গেলো হাসপাতালে। ইমার্জেন্সী বিভাগে নিয়ে যাওয়ার পর রোগীর দেখভাল করা হলো। রোগীর আত্মীয়দের কেউ কেউ শফিককে ধন্যবাদ দিলো।দোয়া করলো তাদের বিপদের দিনে ছুটে যাওয়ার জন্য। শফিক হাসি মুখে তাদের শান্তনা দিয়ে বললো ধন্যবাদ দেওয়ার কিছু নেই এটা আমার নৈতিক দায়িত্ব এবং চাকরির অংশ। মানুষের বিপদের দিনে পাশে দাড়ানোর নামইতো মনুষত্ব। অ্যাম্বুলেন্স গ্যারেজে রেখে ক্লান্ত শরীর নিয়ে বাসায় ফিরলো শফিক। রোকেয়া জেগেই ছিলো।বাকি রাতটা তার আর ঘুম হয়নি। ফজরের আজান হয়ে গেলে শফিক নামাজ পড়ে তার পর আবার ঘুমাতে গেলো।

সারা রাত ঘুম না হওয়ায় শফিকের শরীর ক্লান্তিতে অবস্বাদে ভরে গিয়েছিল। বিছানায় শরীর এলিয়ে দেওয়ার সাথে সাথে তাই রাজ্যের ঘুম নেমে আসলো। ঘুম ভাঙতে ভাঙতে বেশ বেলা হয়ে গেলো। রোকেয়া তার স্বামীর গত রাতের পরিশ্রমের কথা চিন্তা করে ঘুম থেকে ডাকেনি বরং রান্না শেষ করে বাকি কাজ করে বসে ছিলো। সকাল সাড়ে দশটার দিকে শফিকের ঘুম ভাংলো। আড়মোড় ভেঙে সে যখন বিছানায় উঠে বসলো তখন শরীররটা কেমন যেন ব্যাথা ব্যাথা লাগছিলো। শফিকের মনে হলো গত রাতে যে ধকল গেছে তার জন্যই বোধহয় শরীর ব্যথা করছে। বিশেষ করে সারাদিন বিভিন্ন স্থান থেকে রোগি আনা নেওয়া করতে করতে রাত বারটা বেজে গিয়েছিল তার ওপর বাসায় ফিরে ঘুমাতে যাওয়ার পর পরই আবার বেরিয়ে যাওয়ায় শরীরটার উপর অনেক ধকল গেছে। রক্ত মাংসের শরীর আর কতইবা সহ্য করতে পারে।

বিছানা থেকে নেমে গোসল করে রোকেয়াকে বললো খাবার দিতে। খাবার খেতে খেতে গত রাতের গল্প করলো।সে যাওয়ার পর রোগীর বাড়ির লোকদের মধ্যে কেমন স্বস্তি ফিরেছিলো তা বললো। হাসপাতালে পৌছে দেওয়ার পর রোগীর আত্মীয়রা কেমন কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছিল সব বললো। সেসব শুনে রোকেয়ার মনটা ভরে গেলো। তার স্বামী মানুষের জন্য কত পরিশ্রম করে।
শফিকের একমাত্র মেয়ে হুমায়রা তখন স্কুলে। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলো।

বিকেলের দিকে শফিক আবার হাসপাতালে গেলো। হাসপাতালে গিয়ে উধ্বর্তন কর্মকর্তার কাছে পাঁচদিনের ছুটির আবেদন করলো।বেশ কিছুদিন শফিক টাকা খাটুনি খেটে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। হাসপাতাল থেকে তাকে পাঁচদিনের ছুটি দিয়ে দিলে শফিক বাসায় ফিরে আসলো। বেশ কিছুদিন হলো গ্রামের বাড়িতে যাওয়া হয় না। বাড়িতে বৃদ্ধ মা আছেন তার সাথেও দেখা হয়না অনেক দিন। যদিও ফোনে মাঝে মাঝেই কথা হয়। হাসপাতাল থেকে বাসায় ফিরতে ফিরতে শফিক ভাবলো কাল সকালে গ্রামের বাড়িতে যাবেন। রাতে খেতে বসে স্ত্রীকে বললেন অফিস থেকে পাঁচদিনের ছুটি পেয়েছি কাল সবাই মিলে গ্রামে যাবো। একথা শুনে রোকেয়া যেমন খুশি হলো তেমনি তাদের একমাত্র কন্যা হুমায়রাও খুব খুশি।

চারদিকে কী এক অসুখ হানা দিয়ে সব কিছু ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছে। সারা বিশ্ব থমকে গিয়েছে। আজই সরকারী নির্দেশে সব স্কুল কলেজ বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে হুমায়রাও বেশ খুশি। সে রাত কোন মতে কেটে গেলে পরদিন সকাল দশটার দিকে পরিবার সহ শফিক তার গ্রামের বাড়িতে চলে গেলো। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হলো তার পর রাত নেমে এলো। রাতের খাবার খেয়ে হুমায়রা তার দাদীর সাথে ঘুমাতে গেলো আর শফিক এবং রোকেয়া নিজেদের ঘরে থাকলো। রাত তখন দুইটা হবে হয়তো এমন সময় শফিকের শরীর কাপিয়ে জ্বর উঠলো।করোনা ভাইরাসের প্রোকোপ চারদিকে এতো বেশি ছড়িয়ে পড়েছিল যে চারদিকে অনেক রকম গুজবও মাথা চাড়া দিয়ে উঠছিলো।

সেই রাতে প্রচন্ড জ্বর আর গলা ব্যাথার সাথে সর্দি কাশিতে অন্যের বিপদে রাত দিন এক করে ছুটে যাওয়া শফিকের প্রাণ যায় যায় অবস্থা। বাড়িতে পুরুষ মানুষ বলতে শফিক ছাড়া আর কেউ ছিলো না। রোকেয়া সেই মধ্য রাতে আসেপাশে নিকটাত্মীয় থেকে শুরু করে গ্রামের অনেকের কাছে ডাক ছেড়ে সাহায্য চেয়েছিল কিন্তু কেউ এগিয়ে আসেনি।যখন শুনেছে শফিকের শরীরে জ্বর আর সর্দি কাশি তখন সবাই করোনা আক্রান্ত হয়েছে ভেবে কেউ এগিয়ে আসেনি। অথচ এই শফিকই বিপদে আপদে তাদের পাশে গিয়ে দাড়াতো।অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে বেড়াতো। তার বিপদের দিনে কেউ তার পাশে নেই।

রোকেয়া মোবাইল থেকে হাসপাতালে অনেক বার ফোন করলো অ্যাম্বুলেন্সের জন্য কিন্তু কেউ ফোন রিসিভ করলো না।থানায় ফোন করলো,জরুরী সেবায় ফোন করলো কিন্তু কোথাও সে কোন আশার আলো দেখতে পেলো না। জ্বরে ছটফট করতে থাকা স্বামীর পাশে নিরুপায় রোকেয়া ভাষাহীন। যে স্বামীর কাজ নিয়ে তার গর্ব হতো সেই স্বামীর বিপদের সময়ে তার খুব অবাক লাগলো কাদের জন্য তার স্বামী এতো ত্যাগ স্বীকার করেছে!কিভাবে কিভাবে যে ছটফট করতে করতে রাতটা পার হলো তা রোকেয়া ছাড়া কেউ জানে না।শফিক ততক্ষণে আরও ক্লান্ত হয়ে অনেকটাই শান্ত হয়ে গেছে। ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই রোকেয়া বেরিয়ে পড়ে। যদি একটা ভ্যান অন্তত পাওয়া যায় তবে স্বামীকে নিয়ে হাসপাতালে যেতে পারবে।আসেপাশে অনেক ভ্যান থাকলেও কেউ রাজি হলো না।

গ্রামের শেষ মাথায় গরীব ভ্যানচালক মজিবর কাকার বাড়ি। মজিবর কাকার বয়স হয়েছে অনেক। তার পরও পেটের দায়ে এখনো ভ্যান চালাতে হয়। রোকেয়া গিয়ে দাড়ায় মবিজর কাকার বাড়িতে। কেদে কেদে বলে তার করুণ অবস্থার কথা।মজিবর কাকা তাকে শান্তনা দিয়ে বলে কাদিস না মা আল্লাহর উপর ভরসা রাখ।তার পর তিনি শত ছেড়া একটা জামা গায়ে গামছাটা কাধে নিয়ে রোকেয়াকে সাথে করে ফিরে আসে রোকেয়াদের বাড়িতে। শফিককে ধরে ভ্যানে তুলে রোকেয়াকে সাথে নিয়ে ছুটে চলে সদর হাসপাতালে।বাড়িতে থেকে যায় একমাত্র মেয়ে হুমায়রা।

জেলা সদরে পৌছাতে পৌছাতে সাড়ে বারটা বেজে যায়। শফিক যেহেতু সদর হাসপাতালেই চাকরি করে তাই হাসপাতালের সবাই তাকে চেনে। তার এই অবস্থা দেখে তাদেরও মায়া হয়। স্ট্রেচারে করে তাকে ইমার্জেন্সিতে নিয়ে যাওয়া হয়। ষাটোর্ধ ভ্যান চালক মজিবর শফিককে নামিয়ে দিয়ে খালি ভ্যান টানতে টানতে বড়বাজারের দিক দিয়ে যেতে থাকে। সব কিছু বন্ধ থাকায় না খেয়ে মরার অবস্‌থা। দু একটা খ্যাপ পেলে যদি এক দুই কেজি চাল ডাল নেওয়া যায় তবে বউ বাচ্চা নিয়ে অন্তত বেচে থাকা যাবে। না হলে না খেয়েই মরতে হবে।

বড় বাজার মোড়ের কাছে আসতেই একদল পুলিশ তাকে থামিয়ে দেয়।সে বলারও সুযোগ পায়না যে সদর হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্সের ড্রাইভার শফিক খুব অসুস্থ্য তাকে ভ্যানে করে হাসপাতালে নিয়ে এসেছে। কেউ এসব শোনার মত সময় হাতে রাখেনি। শপাং শপাং করে লাঠির বাড়ি পড়তে থাকে মজিবর নামের ষাটোর্ধ ভ্যান চালকের পিঠে। শত ছিন্ন জামার ভিতরে সেই সব লাঠির দাগ পড়তে থাকে,জমতে থাকে রক্ত আর ঘাম।ভ্যান চালক মজিবর যখন মার খাচ্ছে তখন সে জানতেও পারেনি একটু আগে সে যে শফিককে ভ্যানে করে নিয়ে এসেছিল সে এখন আর শফিক নেই সে এখন লাশ। একটু অপেক্ষা করলে হয়তো তার ভ্যানেই লাশটাকে গ্রামে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারতো। শফিকের লাশ পাশে নিয়ে ডাক্তারদের কথা মত নিরাপদ দূরত্বে বসে আছে বাকহীন রোকেয়া।হয়তো ততোক্ষণে গ্রামে রটে গেছে শফিক আর নেই। হয়তো শফিকের মা গগণবিদারী আর্তনাদে পুরো আকাশ ভারি করে ফেলছে। ছোট্ট হুমায়রা হয়তো গড়াগড়ি খাচ্ছে মাটিতে। কিংবা বাবা মারা গেছে এই বিষয়টি হয়তো তার মাথায় ঢোকেনি।

নিষেধাজ্ঞার এই সময়ে ভ্যান নিয়ে আর বাইরে বের হবোনা এই মর্মে অঙ্গিকার করে মজিবরকে ছেড়ে দেওয়া হলে মজিবর শরীরে অজস্র ক্ষত নিয়ে বাড়িতে ফিরে আসলো। তার ফেরার অপেক্ষায় ছিলো তার স্ত্রী কন্যা। সে সাথে করে নিয়ে আসবে কিছু চাল ডাল তবেই রান্না হবে।কিন্তু তাকে ফিরতে হয়েছে খালি হাতে। শফিককে নিয়ে যাওয়ার বদলে সে হয়তো কিছু টাকা পেতো কিন্তু শফিক যেরকম অসুস্থ্য তাতে টাকা চাওয়ার মত অবস্থা ছিলো না। রোকেয়াও টাকা দেওয়ার মত অবস্থায় ছিলো না। অন্য কোথাও খ্যাপ মেরে দুই একশো টাকা আয় করতে পারতো পুলিশের কারণে তাও হয়নি। সুতরাং মজিবরকে খালি হাতেই ফিরতে হয়েছে।ঘরে চাল ডাল যা আছে তা এক ওয়াক্ত হতে পারে তার পর না খেয়ে মরতে হবে।

বিকেলের দিকে ষাটোর্ধ মজিবর জাল নিয়ে মাছ ধরার আশায় কুশিয়ারা নদীতে গেলো। কোন কিছুতেই তার খেয়াল নেই কেবল পেটের ক্ষুধা ছাড়া। মাছ ধরতে ধরতে সে সীমান্তের কাছে চলে গেলো। একটু পর একঝাক পাখি আকাশে উড়ে গেলো আর ঠাস করে দুটো শব্দ হলো। আকাশে ভেসে থাকা পাখি গুলি দেখলো নদীর কিনারে লুটিয়ে পড়ছে একটি মানুষ। মানুষটি মজিবর।বিএসএফ এর গুলিতে সে মারা গেছে। এমনিতেও মরতো না খেয়ে সেখানে গুলি খেয়ে মরতে হলো তাকে। একপ্রকার বেচে গেলো সে অন্তত স্ত্রী কন্যাকে না খেয়ে মরা দেখতে হলো না।

গ্রামের কবরস্থানে দুটো কবর হওয়ার কথা ছিলো। একটি বিএসএফ এর গুলিতে নিহত ষাটোর্ধ মজিবরের আরেকটি সদর হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্সের ড্রাইভার শফিকের। কিন্তু রোকেয়া দেখলো মাত্র একটি কবর খোড়া হয়েছে। কবরটা মজিবরের। রোকেয়ার স্বামী শফিকের জন্য কোন কবর খোড়া হয়নি। গ্রামবাসী এক হয়ে ঘোষণা করেছে করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া কারো লাশ এই কবর স্থানে মাটি দিতে দেওয়া হবে না। উঠোনের এক কোণায় গাছের নিচে শফিকের লাশ রাখা হয়েছে। কোথাও কেউ নেই। আশে পাশে কোন আত্মীয় নেই,পাড়া প্রতিবেশী নেই শুধু বারান্নায় আহাজারি করছে শফিকের বৃদ্ধ মা আর এক কোণায় বাকহীন রোকেয়া অপলোক তাকিয়ে আছে স্বামীর লাশের দিকে।

সেই চোখে স্বামীর লাশ দেখছে না বরং বার বার ভেসে উঠছে সেই সব দিন রাতের কথা যখন তার স্বামী সব সুখ বিসর্জন দিয়ে অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে ছুটে চলেছে অন্য কারো বিপদে,অন্য কারো মুখে হাসি ফোটাতে। অন্ধকারের বিদর্ভ নগরে রোকেয়ার কেবলই মনে হয় তার স্বামী কি তবে ভুল করেছে মানুষের বিপদে পাশে থেকে!যদি সে রাতে সে স্বামীকে ধরে রাখতে পারতো,যদি সে রাতে স্বামীকে দ্বিতীয়বার বের হতে না দিতো! হয়তো তার স্বামী বেঁচে থাকতো।

পুলিশ এসে শফিকের লাশের অন্তিম সৎকারের ব্যবস্‌থা করলো। সরকারী নির্দেশে শফিকের বাড়ি কোয়ারান্টাইনের আওতায় রাখা হলো। আশেপাশের বিশ ত্রিশটা বাড়িও কোয়ারান্টাইনে রাখা হলো। রোকেয়া যানে তার বাড়ি ছাড়া আর কারো বাড়ি কোয়ারান্টাইন না হলেও চলতো। কেউতো আসেনি কখনো।মৃতরা কি করে অন্যের বিপদে এগিয়ে আসবে? তারাতো সেই কবেই মরে গেছে।রোকেয়ার চেহারাটা ভাবলেশহীন। সে দেখতে পেলো পুলিশ,অ্যাম্বুলেন্স,নার্স,ডাক্তার সবাই আছে। যখন থাকার কথা ছিলো তখন কেউ তার ডাকে সাড়া দেয়নি। যখন কাউকে দরকার নেই তখন অন্ধকারের বিদর্ভ নগরে সবাই এসে হাজির। কিয়ামতের দিন কেউ কারো পাশে থাকবে না। এ যেন তারই রিহার্সাল।

গল্পঃ কিয়ামতের আগে
জাজাফী
২৮ মার্চ ২০২০