এতিম শহর কিংবা সৎ বাবার সংসারে বসবাস

কী এক আশ্চর্য টানে প্রতিনিয়ত অগণিত মানুষ গ্রাম,গঞ্জ,মফস্বল শহর ছেড়ে পাড়ি জমাচ্ছে এক যাদুর শহরে যার নাম ঢাকা। নাম ঢাকা হলেও আদতে তার পুরোটাই খোলা। ডাস্টবিন খোলা,ড্রেন খোলা,ম্যানহোল খোলা,ওবারব্রিজের ছাদ খোলা।অগণিত মানুষের ঘুমানোর জন্য কোন ছাদ নেই।তারা প্রতি রাতে খোলা আকাশের নিচে রাত কাটায়। দূর থেকে আশ্চর্য মায়াবী শহরটির সৌন্দর্য কল্পনা করে ছুটে আসা মানুষগুলো দুদিনেই বুঝতে পারে সবটাই ভ্রম,ভিতরে ভিতরে শহরটা নষ্ট হয়ে গেছে। কংক্রিটের এই শহরে বিশুদ্ধ বলে যা কিছু আছে ভিতরে ভিতরে কোনটাই বিশুদ্ধ নয়। ঢাকা শহরের বতর্মান অবস্থা দেখে অনায়াসে বলা যায় এটি একটি এতিম শহর। এর পিতা মাতা বলে কিছু নেই। যদি থাকতো তবে অযত্ন অবহেলায় আজ এর এমন করুণ অবস্থা হতো না। আর এ শহরে যারা বাস করছে তারা যেন সৎ বাবার সংসারে বসবাস করছে। একান্তুই যারা ঢাকা শহরকে এতিম হিসেবে মেনে  নিতে রাজি নন তাদের জন্য বলা যেতে পারে ঢাকা শহর এতিম না হলেও সৎ বাবার সন্তান হিসেবে দিন কাটাচ্ছে। নগর পিতা বলে আমরা যাদের সম্মোধন করছি তারা সৎ বাবার ভূমিকায় অভিনয় করছে। যে বাবা সৎ সন্তানের কিসে ভালো হয় কিসে মন্; হয় তা নিয়ে কোন মাথা ব্যতা নেই। সৎ ছেলে কোথায় গেলো না গেলো, কি খেলো না খেলো তাতে তার কিছুই যায় আসে না। এতিম অথবা সৎ বাবার সন্তান বলেই  ঢাকা শহরের আজ করুণ অবস্থা।

চর্মচক্ষু দিয়ে যারা ঢাকা শহরের সুউচ্চ ভবন,ফ্লাইওভার,মেট্রোরেল,বিলাসবহুল সিনেমা হল,নামি দামী রেস্টুরেন্ট,শপিংমল আর রাস্তার দামি দামি গাড়ি দেখে এ শহর উন্নতির দিকে যাচ্ছে ভেবে আত্মতৃপ্তিতে ভুগছেন তারা নিছক একটা অংশ দেখেছেন যা তাদের সামনে। ধারনক্ষমতা বলে একটি কথা আছে যা এ শহরের বিভিন্ন বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্তরা কোনদিন ভেবেও দেখেনি।তারা মনে করেন শহরের আবার ধারণ ক্ষমতা কি?শহরতো শহরই। সামান্য একটি লিফটেও যেখানে বলে দেওয়া হয় ধারণ ক্ষমতা 8জন বা 10 জন সেখানে একটা পুরো শহর সেসবের বাইরে। তরতর করে গড়ে উঠছে সুউচ্চ ভবন।কোনটি দশতলা,কোনটি বিশতলা আবার কোনটি ত্রিশ তলা।আমাদের নীতিনির্ধারকেরাই সেগুলোর অনুমদোন দিচ্ছেন। কিন্তু যেখানে দশতলা,বিশতলা বা ত্রিশতলা ভবন গড়ে উঠছে সেখানকার ধারণক্ষমতা কতটুকু?ঐ যায়গাতে যে পরিমান মানুষ বসবাস করতে শুরু করবে তাদের জন্য পযার্প্ত বিশুদ্ধ পানি,বিশুদ্ধ বাতাস,খেলার মাঠ কি আছে?সেসব না ভেবেই সুউচ্চ ভবন নির্মানের অনুমোদন দিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এতো মানুষের জন্য যে পরিমান অক্সিজেন দরকার সে পরিমান সবুজায়ন কি  আমরা করতে পেরেছি। এতো মানুষের জন্য বিদ্যুৎ,গ্যাস,পানি সবর্রাহ কোথা থেকে আসবে? পয়োনিষ্কাষন ব্যবস্থার কি হবে? রাস্তাঘাটে যানবাহনের যে চাপ তৈরি হবে সেগুলো কি কেউ একবারও ভেবে দেখেছে?

এ শহরকে তাই বড্ড এতিম নয়তো সৎ বাবার সন্তান বলে মনে হয়। তাইতো নগরপিতা বা আর যারাই দায়িত্বে আছেন তারা সেসব ভাবেন না। সৎ সন্তান গোল্লায় গেলেইবা কার কি! যেখানে পাঁচতলা ভবন থাকার কথা সেখানে বিশতলা ভবন হচ্ছে। পাঁচটি পরিবারের স্থলে ঠাই নিচ্ছে পঞ্চাশটি পরিবার। যে ছোট্ট খেলার মাঠে বিশজন শিশু নির্বিঘ্নে খেলতে পারতো সেখানে খেলতে আসছে দুইশো শিশু। আর এভাবেই কদিন বাদে সেই খেলার মাঠগুলোও চলে যাচ্ছে প্রাইভেট ক্লাবগুলোর হাতে। তার পর নির্দিষ্ট কিছু শিশুরাই কেবল সেখানে খেলার সুযোগ পাচ্ছে।আবাহানী মাঠ থেকে শুরু করে কলাবাগান,উত্তরা,গুলশান এতিম শহরের সবর্ত্রই একই অবস্থা।এতিম শহরে পার্ক বলে সেই রমনা পার্ক আর  বোটানিক্যাল গার্ডেন ছাড়া আর কিছু নেই। দুটোর যে কোনটিতে পৌছাতে হলে বাসা থেকে দুই তিন ঘন্টা সময় হাতে নিয়ে বেরোতে হবে। বাকি দু চারটা বেসরকারী পার্ক নামে মাত্র পার্ক হিসেবে চলছে। কাকের পিঠে ময়ুরের পেখম লাগিয়ে ময়ুর নাচ দেখানোর মতই অবস্থা।একটা ফোয়ারা,দুটো দোলনা আর পায়ে হাটা পাথর বসানো পথ নিয়ে সেগুলো পার্ক নামধারণ করে আছে।সবুজের নামগন্ধও নেই বলা চলে। আমাদের মধ্যে সমন্বয়ের বড়ই অভাব। সংসদে কেউ যখন কোন প্রস্তাব উত্থাপন করেন সেটি পাশ হয় হ্যা অথবা না ভোটের মাধ্যমে। কারো কোন যৌক্তিক মতামত নেওয়া হয় না।আনীত প্রস্তাবের কোন অংশ সংযোজন বা বিয়োজনের প্রয়োজনীয়তা আছে কি না সে ব্যাপারে মতামতের সুযোগ খুবই কম। সরাসরি হ্যা অথবা না করে দেওয়ার মতই এ শহরের অভিভাবকেরা কারো কোন মতামত না নিয়ে নিজেদের খেয়ালখুশি হতো যা খুশি করছে।

এতিম শহরের মানুষগুলোও এতিম কিংবা সৎ মায়ের সংসারে বড় হওয়া সন্তানের মত। আমরা সবাই সৎমায়ের সংসারে বড় হচ্ছি।তবে একটা কথা বলতে হয় অনেক সৎমা তার সব সন্তানকে নিজের সন্তানের মত লালনপালন করে থাকেন কিন্তু এ শহরের দায়িত্ব নিয়ে যারাই বেসেছেন তারা সেই সব সৎ মায়েদের ভুমিকায়ও অবতীর্ন হতে পারেন নি। তাই তাদেরকে সৎ মায়ের সাথে তুলনা করলে প্রকারান্তে অসংখ্য ভালো সৎ মাকে ছোট করা হয়।আমরা কিসে ভালো থাকবো,কিসে আমাদের ভালো হবে তা নিয়ে কারো মাথা ব্যাথা নেই।আমাদের মতামতের কোন দাম নেই।উন্নয়নের সংজ্ঞা আমাদের শিখিয়ে দেওয়া হচ্ছে। তারা যা শেখাচ্ছে সেটাই সব,আমাদের মত করে বলার কিছু নেই।

মেট্রোরেল হচ্ছে,ফ্লাইওভার হচ্ছে,টানেল হচ্ছে এগুলো অবশ্যই অবকাঠামোগত উন্নয়ন। কিন্তু আমাদের কি চাই আর কি চাই না তা কেউ জানতে চায়নি। পরিবারের পাচজন সদস্যের জন্য যখন একটি টেলিভিশন থাকে তখন সবার পছন্দ এক হবে এমন নয়।কেউ খবর দেখবে,কেউ খেলা দেখবে,কেউ সিরিয়াল দেখবে আবার কেউ কার্টুন দেখবে।এখন অভিভাবক তকমা গায়ে লাগিয়ে রিমোর্ট হাতে আপনি যদি আপনার ইচ্ছেমত চ্যানেল চালিয়ে রাখেন তবে বাকিরা নিজেদের সৎ মায়ের সন্তান নয়তো এতিম ভাবা ছাড়া আর কি করতে পারে? এ শহরে কত শ্রেণীর মানুষ আছে,সবার চাহিদা আলাদা,মতামত ভিন্ন। কিছুদিন আগেও নেতারা বাসযোগ্য ঢাকা গড়বো স্লোগান শুনিয়ে ভোটরদের দৃষ্টি আকর্ষন করতে চেষ্টা করেছিল। কিন্তু বাসযোগ্য ঢাকা আসলে কি সেটা কি তারা কখনো আমাদের কাছে জানতে চেয়েছেন? তারা যে ঢাকাকে বাসযোগ্য করতে চায় সেটা কাদের জন্য? টিভি রিমোর্ট হাতে নিজের পছন্দের চ্যানেল চালিয়ে রাখা অভিভাবকের মত তারাওকি নিজেদের মত করে বাসযোগ্য ঢাকা তৈরি করবে।

বাসযোগ্য ঢাকা বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষের কাছে বিভিন্ন রকম হতে পারে।তরুণ যুবকেরা কিভাবে দেখে বিষয়টি,শিশু কিশোরদের জন্য বাসযোগ্য ঢাকা কেমন হতে পারে?গৃহীনী নারীর চোখে বাসযোগ্য ঢাকা কেমন আর কর্মজীবী নারীর চোখে কেমন তা জানার মানুষ নেই। বরং কারো কাছ থেকে এসব না জেনে নগরপিতারা নিজেদের মত করে বাসযোগ্য ঢাকা গড়বে।সেই ঢাকা এতিম শহর বাসির জন্য বরাবরের মতই এতিম শহর হিসেবে থাকবে নাকি পরিবর্তন আসবে তা আমরা জানি না।বয়স্ক মানুষের জন্য বাসযোগ্য ঢাকার সংজ্ঞা যেমন হবে তরুণদের জন্য তা নাও হতে পারে। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষেরাও নিশ্চই তাদের মত একটি শহর কল্পনা করে যেখানে তাদের সুযোগ সুবিধাগুলো থাকবে।পাজেরোতে চলাচলকারী আর পায়ে হাটা দিনমজুরের চোখে বাসযোগ্য ঢাকা একরকম হবে না।সংস্কৃতিকর্মীরা চাইবে যেন পযার্প্ত সংস্কৃতি চর্চার সুযোগ থাকে। কিন্তু কোন দিন এসব নিয়ে কেউ ভাবেন না। হাতে রিমোর্ট পাওয়ার পর কোন চ্যানেল চলবে তা তারা নিজেরাই ঠিক করেন। এতিম শহরবাসীর আর বলার কিছু থাকে না। তারা বার বার ঠকে। অগত্যা নিজেদের ভাগ্যকে দোষ দেয়। দূর থেকে ঝাউবন ভেবে ছুটে এসে এ শহরের মানুষগুলো উলুখাগড়ার স্তুপ দেখে শুরুতেই যে হোচট খায় তা বয়ে চলে বাকি জীবন। খুব কম মানুষই এই মিছে মায়া কাটিয়ে বেরিয়ে যেতে পারে।

আমরা ডিজিটাল বাংলাদেশ স্লোগান দিয়ে নিজেরাই নানা ভাবে এনালগে আটকে আছি। নির্বাচনী প্রচারনায় কোটি কোটি পোষ্টারে ছেয়ে ফেলি গোটা শহর। শহরটাকে যারা পরিস্কার রাখবে বলে দায়িত্ব নিতে চায় তারাই এটিকে সবচেয়ে বেশি নোংরা  করে রাখে। সাধারণ জনগণ পোষ্টার,ব্যানার,ফেস্টুন,বিলবোর্ড লাগায় না,ওগুলো সব অভিভাবক তকমা গায়ে লাগানো সৎ বাবাদের কাজ। দিন যতই যাচ্ছে এ শহরের অবস্থা আরও করুণ হচ্ছে। কোথাও কোন কিছু পরিকল্পিত ভাবে হচ্ছে না। আমরা হরহামেশাই রাস্তাখোড়াখুড়ি দেখতে পাই। আজ সুয়ারেজ লাইনের কাজের জন্য খোড়া হচ্ছে তো কিছুদিন পর গ্যাস লাইনের জন্য ভালো রাস্তা আবার খোড়া হচ্ছে।সম্পদের ক্ষতি হচ্ছে,জনদুর্ভোগ হচ্ছে। অথচ সঠিক পরিকল্পনা  থাকলে রাস্তা একবার খুড়েই সবগুলো সমস্যা মিটিয়ে ফেলা যেতো। সবকিছুর একটি ধারণ ক্ষমতা থাকে। এ শহরেরও ধারণ ক্ষমতা সীমিত অথচ এর জনসংখ্যা এর ধারণ ক্ষমতাকে অতিক্রম করে গেছে বহু আগেই।তারপরও প্রতিনিয়তই লাখ লাখ মানুষ এ শহরে হাজির হচ্ছে অন্ধ মোহে।আমরা এই মোহ থেকে মানুষকে বাচাবার জন্য উদ্যোগ নিতে ব্যার্থ হয়েছি।ফলে দুর্গতি আরো বাড়ছে। বিদ্যুৎ,গ্যাস,পানির সংকট প্রকট হচ্ছে।রাস্তায় যানবাহন বাড়ছে,যানজট ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। বাতাস দুষিত হচ্ছে,শহরের উপর চাপ বাড়ছে, রোগাক্রান্ত হচ্ছে সব বয়সী। একটি বেলুন আপনি চাইলেই ইচ্ছেমত ফুলাতে পারবেন না। তার একটি ধারণক্ষমতা আছে। তার বেশি ফুলাতে চাইলে তা ফেটে যাবে। এ শহরের ধারণক্ষমতা অনেক আগেই সীমা ছাড়িয়ে গেছে।এর পরও যদি এভাবে চাপ বাড়তে থাকে তবে বেলুনের মতই এ শহরটা ফেটে যাবে। আমাদের এতিম শহরটাকে বাচাতে হবে। আমরা সৎ মায়ের সংসারে বেড়ে ওঠা সন্তানেরা কিছুই করতে পারছি না। যে দুজন নগরপিতার আসনে বসেছেন তারা এ শহরের সত্যিকারের বাবা হবেন নাকি সৎ বাবা থেকে যাবেন তার উপর নির্ভর করছে শহরের ভবিষ্যৎ। ভবিষ্যতে দাবার ঘুটির মত চিন্তা ভাবনা করে পদক্ষেপ নিতে হবে।যেখানে একটি সৈন্য যেমন গুরুত্বপুর্ন তেমনি ঘোড়াও গুরুত্বপুর্ন।শুধু রাণী বাচিয়ে চলতে গেলে একসময় একটা সৈন্যও অবশিষ্ট্য থাকবে না আর তখন রাজ্য হারা হতে হবে। বাসযোগ্য ঢাকা নির্মানের স্বপ্ন যদি নগরপিতাদের থেকে থাকে তবে নগরবাসীদের প্রতি তাদের প্রথম আহ্বান হতে হবে “ আসুন আমরা আলোচনা করি,ঢাকাকে কিভাবে বাসযোগ্য করে গড়ে তোলা যায়”

কিন্তু তারা কি সেই আহ্বান করবেন? কোনদিনতো এমন আহ্বান করতে দেখিনি। রিমোর্ট হাতে থাকলে কি আর কেউ অন্যের পছন্দ অপছন্দের গুরুত্ব দেয় কখনো! তবে কি এ শহর বরাবরের মতই এতিম থেকে যাব? আর আমরা থেকে যাবো সৎ বাবার সংসারে!

২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০